গিলগিত–বালতিস্তানের ইতিহাস (২ম পর্ব)

মূল : সাফকাত হোসাইন

সাদিক হাসান

দ্বিতীয়বার ও এবারে স্থায়ীভাবে গিলগিত এজেন্সি প্রতিষ্ঠার পেছনের ঘটনাগুলো ছিল মূলত ‘গ্রেট গেম’-এরই অংশ। ১৮৮৫ সালে রুশ সৈন্যরা হুনজা সীমান্তের ঠিক উত্তরে পাঞ্জদেহ মরূদ্যানের কাছে আফগান ভূখণ্ড দখল করে নেয়। ওই সময়ে ব্রিটিশ ও রুশরা তাদের নিজ নিজ প্রভাব বলয় নির্ধারণের জন্য একটি সীমান্ত চুক্তির বিষয়ে আলোচনা করছিল। এটি সাধারণভাবে স্বীকৃত ছিল যে, আফগানিস্তান হবে একটি ‘বাফার জোন’, যেখানে কোনো পক্ষই হস্তক্ষেপ করবে না। রুশদের এই আক্রমণের ঘটনা ব্রিটিশদের কাছে সেই চুক্তির লঙ্ঘন হিসেবে প্রতীয়মান হয়, কারণ ব্রিটিশরা আমুদরিয়া নদীর দক্ষিণের যেকোনো অঞ্চলকে তাদের প্রভাব বলয়ের অন্তর্ভুক্ত মনে করত। এক বছর পর ১৮৮৬ সালে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে, যখন হুনজার শাসক মীর গাজান খানের কনিষ্ঠ পুত্র সাফদার আলী তাকে হত্যা করে নিজেই মীর হয়ে বসে। দুই বছর পর ১৮৮৮ সালে সাফদার আলী নগর বাহিনীর সাথে জোট বেঁধে চপ্রোত দুর্গ কব্জায় নেয়, যা গিলগিত অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণে ছিল। এই ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে ব্রিটিশরা রুশ হুমকির বিষয়ে তাদের নীতি পরিবর্তন করে ও ১৮৮৯ সালে আলজেরন ডুরান্ডকে রাজনৈতিক এজেন্ট হিসেবে নিয়োগ দিয়ে পুনরায় গিলগিত এজেন্সি প্রতিষ্ঠা করে।

১৮৮৯ সালের শরতে, ডুরান্ড হুনজার নতুন মীর সাফদার আলীর সাথে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে, যিনি একটি ভর্তুকির বিনিময়ে তার অঞ্চলটি ব্রিটিশ কূটনৈতিক মিশনের জন্য উন্মুক্ত করতে রাজি হন। ব্রিটিশদের পক্ষ থেকে বারবার হুমকি, সতর্কবার্তা এবং প্ররোচনা সত্ত্বেও হুনজার মীর সাফদার আলী গিলগিত এবং হুনজার রাজধানী বালতিতের মধ্যে একটি রাস্তা নির্মাণের অনুমতি দিতে অস্বীকার করে। ১৮৯১ সালের ডিসেম্বরে ব্রিটিশ বাহিনী হুনজা আক্রমণ করে মাত্র তিন সপ্তাহের মধ্যে রাজ্যটি দখল করে নেয়। হুনজাকে রুশ সেনাবাহিনীর গতিবিধি পর্যবেক্ষণের জন্য একটি ‘অগ্রবর্তী পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র’-এ পরিণত করা হয়। ব্রিটিশরা পৌঁছানোর আগেই সাফদার আলী কাশগড়ে পালিয়ে যায়, যা সেই সময় চীনের সাম্রাজ্যের অংশ ছিল এবং সেখানে তাকে রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে গ্রহণ করা হয়। ব্রিটিশরা তার এগারো বছর বয়সী ভাই নাজিম খানকে মীর হিসেবে নিযুক্ত করে, যিনি পরবর্তী চার দশক হুনজা শাসন করেছিলেন।

গিলগিত এজেন্সি ছিল কাশ্মীর রাজ্যের প্রশাসনিক সংস্থা (ওজারাত)-এর সমান্তরাল একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থা। এই এজেন্সিটি একজন ব্রিটিশ রাজনৈতিক প্রতিনিধির নেতৃত্বে পরিচালিত হতো, অন্যদিকে কাশ্মীর ওজারাত পরিচালিত হতো কাশ্মীর রাজ্যের একজন কর্মকর্তার মাধ্যমে। এই দু’টি প্রশাসনিক ব্যবস্থার মধ্যে প্রায়ই চরম উত্তেজনা বিরাজ করত; কারণ ব্রিটিশরা প্রায়ই সন্দেহ করত যে—কাশ্মীর সরকার গোপনে রাশিয়ার সঙ্গে যোগসাজশ করছে ও তাদের সাহায্য করছে। গিলগিত এজেন্সি ও গিলগিত ওজারাতের মধ্যে এই দ্বন্দ্ব কেবল প্রশাসনিক ক্ষমতার পরিধি নিয়ে ছিল না, বরং তা আঞ্চলিক সীমানা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। উদাহরণস্বরূপ, ব্রিটিশরা কখনোই হুনজা, নগর, পুনিয়াল, ইয়াসিন, ইশকোমান এবং দক্ষিণ চিলাসের কিছু অংশকে কাশ্মীরের অংশ হিসেবে স্বীকার করেনি। তবে তারা গিলগিত উপত্যকা, আস্তোর এবং বালতিস্তানকে কাশ্মীর রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত বলে মনে করত; এবং বলা বাহুল্য যে, কাশ্মীরি কর্মকর্তারা ব্রিটিশদের এই অবস্থান কখনোই মেনে নেয়নি।

১৮৯১ সালে হুনজা বিজয়ের পরবর্তী এই অঞ্চলের ইতিহাস হুনজার উত্তর সীমান্তে চীনের সাথে এবং স্বাভাবিকভাবেই কাশ্মীর ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সাথে সীমানা নির্ধারণে ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের প্রচেষ্টার দ্বারা চিহ্নিত। ১৮৯৫ সালে ‘ডুরান্ড লাইন’ প্রতিষ্ঠার পর এই বিষয়টি আরও জরুরি হয়ে ওঠে, যা উত্তর-পশ্চিমে আফগানিস্তান এবং কার্যত রাশিয়ার সাথে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সীমানা নির্ধারণ করেছিল।

উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে ব্রিটিশ ভূগোলবিদ এবং রাজনীতিবিদদের কাছে এটি সাধারণভাবে স্বীকৃত ছিল যে, ব্রিটিশ ও চীনা সাম্রাজ্যের মধ্যকার সীমানা হলো কারাকোরাম পর্বতমালার প্রধান চূড়া, যা এই অঞ্চলে উত্তর-পশ্চিম থেকে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে বিস্তৃত। কারাকোরামের এই জলপ্রপাত তারিম অববাহিকাকে সিন্ধু নদ অববাহিকা থেকে পৃথক করেছিল। কিন্তু ১৮৯৯ সালে যখন ব্রিটিশরা আনুষ্ঠানিকভাবে চীনের কাছে এই সীমানার প্রস্তাব দেয়, তার আগে চীনের সাথে এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি বা যোগাযোগ ছিল না। বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকগুলোতে চীনের সাথে হুনজার উত্তর সীমানা নির্ধারণের বিষয়টিতে ব্রিটিশদের অধিকাংশ কূটনৈতিক শক্তি ব্যয় হয়েছিল। কিছু ক্ষেত্রে, গিলগিত এজেন্সির একমাত্র উদ্দেশ্যই ছিল সেই সীমান্ত প্রতিষ্ঠা করা। এই সীমান্ত অঞ্চলটি চিহ্নিত করার জন্য ব্রিটিশদের প্রবল আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও, চীনারা কখনোই ব্রিটিশদের সাথে কোনো আনুষ্ঠানিক সীমান্ত নির্ধারণ চুক্তিতে লিপ্ত হয়নি।

বিংশ শতকের শুরুর দশকগুলোতে মাঝেমধ্যেই গুজব শোনা যেত যে রাশিয়া কাশ্মীর আক্রমণের পরিকল্পনা করছে। এই গুজবগুলো রোমাঞ্চপ্রিয় কর্মকর্তাদের আকাঙ্ক্ষাকে আরও উসকে দিত, তবে এছাড়া এই অঞ্চলটি মূলত বিশ্বের বড় বড় শিকারিদের একটি চারণভূমিতে পরিণত হয়েছিল। তারা এখানে মার্কো পোলো ভেড়া, আইবেক্স এবং মারখোরের বিশাল সব মাথার সন্ধানে আসত। লর্ড কার্জন, রুজভেল্ট ভ্রাতৃদ্বয় এবং ইউরোপীয় রাজদরবারের বিভিন্ন কর্মকর্তা ও রাজপরিবারের সদস্যরা এই অঞ্চলে তাদের শিকারের পিছে ছুটত।

১৯৩৫ সালে ‘ইন্ডিয়া অ্যাক্ট’ পাস হওয়ার পর, ব্রিটিশরা কাশ্মীরের মহারাজার কাছ থেকে গিলগিত এজেন্সি ও এর সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলো ৬০ বছরের জন্য ইজারা নেয়। ১৯৪৭ সালের ১ আগস্ট, ভারত-ভাগের মাত্র দুই সপ্তাহ আগে মাউন্টব্যাটেনের জোরাজুরিতে ব্রিটিশরা স্থানীয় জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিলগিত এজেন্সির দায়িত্ব পুনরায় কাশ্মীর রাজ্যের হাতে ফিরিয়ে দেয়।

পরবর্তী দুই মাস গিলগিত এজেন্সি একটি স্থানীয় বিদ্রোহের মধ্যে জড়িয়ে পড়ে, যা ‘গিলগিত অভ্যুত্থান’ নামে পরিচিতি পায়। দেশভাগের সময় কাশ্মীরের ডোগরা শাসক মহারাজা হরি সিং ভারত নাকি পাকিস্তানে যোগ দেবে সে বিষয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় ছিল; যেখানে তার রাজ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমরা পাকিস্তানে এবং সংখ্যালঘু হিন্দুরা ভারতে যোগ দিতে চেয়েছিল। গিলগিতে এই বিদ্রোহের পেছনে মূল ঘটনাপ্রবাহ আজও বিতর্কের বিষয়। জনপ্রিয় জাতীয়তাবাদী বয়ান অনুযায়ী, এটি ছিল একটি স্বতঃস্ফূর্ত গণঅভ্যুত্থান যেখানে গিলগিত এজেন্সির স্থানীয় মানুষ ডারেল, টাঙ্গির এবং সোয়াত উপত্যকার উপজাতিদের সহায়তায় ডোগরা শাসনের পতন ঘটায়। তবে এই ‘আজাদি আন্দোলন’-এর প্রকৃত নায়ক কারা ও তাদের ভূমিকা কী ছিল, তা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত ও বিতর্ক রয়ে গেছে।

দেশভাগের সময় গিলগিত ছিল গিলগিত স্কাউটস (ব্রিটিশদের দ্বারা গঠিত একটি স্থানীয় আধাসামরিক বাহিনী) ও কাশ্মীর রাজ্যের সৈন্যদের যৌথ কমান্ডের অধীনে। গিলগিত স্কাউটসের নেতৃত্বে ছিল একজন ব্রিটিশ কর্মকর্তা, যিনি গিলগিত এজেন্সিকে কাশ্মীরের হাতে তুলে দেওয়ার ব্রিটিশ সরকারের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেননি। নিজেদের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এক দৃশ্যমান বিদ্রোহে গিলগিত স্কাউটস এবং কাশ্মীর স্টেট ফোর্সের মুসলিম কর্মকর্তারা একত্রিত হয়ে বিদ্রোহ ঘোষণা করে ও প্রধানত অমুসলিম কাশ্মীর স্টেট ফোর্সকে বিতাড়িত করে। ১৯৪৭ সালের ১লা নভেম্বর গিলগিত এজেন্সিকে একটি স্বাধীন প্রজাতন্ত্র হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং পাকিস্তানের সাথে যুক্ত হওয়ার জন্য মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর সরকারের সাথে যোগাযোগ করা হয়। ১৬ই নভেম্বরের মধ্যে উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ থেকে একজন পাকিস্তানি কর্মকর্তা এজেন্সির দায়িত্বভার গ্রহণের জন্য সেখানে পৌঁছায়। পরবর্তী গ্রীষ্মের মধ্যে পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের কমান্ডে একটি স্থানীয় বাহিনী বালতিস্তানকে ‘মুক্ত’ করে। ১৯৪৯ সালে কাশ্মীর নিয়ে অমীমাংসিত বিরোধের জেরে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয় এবং একটি যুদ্ধবিরতি রেখা প্রতিষ্ঠিত হয়। সেই রেখাটিই বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান নিয়ন্ত্রণ রেখা এবং এটিই আধুনিক গিলগিত-বালতিস্তানের দক্ষিণ সীমানা নির্ধারণ করে।

কাশ্মীর রাজ্যটি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। পাকিস্তানি প্রশাসন উত্তরের অংশের দায়িত্ব গ্রহণ করে, যার মধ্যে গিলগিত এজেন্সি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত বা শাসিত এলাকা, লাদাখ ওজারাতের বালতিস্তান জেলা ও মুজাফফরাবাদের জেলাগুলো অন্তর্ভুক্ত। অন্যদিকে দক্ষিণের কাশ্মীর উপত্যকা, জম্মু রাজ্য এবং লাদাখের জেলাগুলো ভারত-শাসিত কাশ্মীরের অংশ হয়ে ওঠে। উভয় দেশই একে অপরের দখলে থাকা ভূখণ্ডের ওপর দাবি রাখে। কাশ্মীরের এই বিষয়টি, অর্থাৎ এটি পাকিস্তান নাকি ভারতের অংশ হবে—তা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে উত্থাপিত হয়। ১৯৪৮ এবং ১৯৪৯ সালে দু’টি প্রস্তাবও পাস করা হয় যেখানে ভারত ও পাকিস্তান উভয়কেই অঞ্চলটি অসামরিকীকরণ করতে এবং জনগণের রাজনৈতিক পছন্দ নির্ধারণের জন্য গণভোট আয়োজন করতে বলা হয়। বলা বাহুল্য, এই প্রস্তাবগুলো আজও বাস্তবায়িত হয়নি। পাকিস্তানের সাথে যুক্ত হওয়ার পর গিলগিত এবং বালতিস্তান উভয়ই আজাদ (স্বাধীন) জম্মু ও কাশ্মীর সরকারের অধীনে আসে, কিন্তু ১৯৪৯ সালে এই অঞ্চলের প্রশাসন কাশ্মীর বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে হস্তান্তরিত হয়।

স্বাধীনতা-পরবর্তী ইতিহাস :

পাকিস্তান দ্বারা শাসিত হওয়ার প্রথম পঁচিশ বছর গিলগিত-বালতিস্তানের (জিবি) রাজনৈতিক অবস্থানে খুব সামান্যই পরিবর্তন এসেছিল। কৌশলগত ও দাপ্তরিকভাবে, জিবি-কে এখনও তৎকালীন জম্মু ও কাশ্মীর দেশীয় রাজ্যের অংশ হিসেবে দেখা হতো, যার অবস্থান দেশভাগের পর থেকে তখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে। পাকিস্তান রাষ্ট্র জিবি-কে তাদের একটি প্রশাসনিক অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করে এবং তাদের ধারণা, যখন কাশ্মীরের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হবে—তখন এই অঞ্চলটি ফেডারেশনে যোগদানের মাধ্যমে পাকিস্তানের সার্বভৌম ভূখণ্ডের অংশ হবে। ততক্ষণ পর্যন্ত, রাষ্ট্রের অন্যান্য প্রদেশের মতো স্থানীয় জনগণ আনুষ্ঠানিক গণতান্ত্রিক রাজনীতি ও স্বায়ত্তশাসন উপভোগ করার সুযোগ ছাড়াই সরাসরি ইসলামাবাদ থেকে এটি শাসিত হওয়ার কথা।

গিলগিত এজেন্সি তখনো কঠোর ‘ফ্রন্টিয়ার ক্রাইমস রেগুলেশন’-এর অধীনে শাসিত হচ্ছিল। এটি ১৯০১ সালে ব্রিটিশদের দ্বারা প্রবর্তিত একটি প্রশাসনিক ও আইনি কোড, যা তাদের সাম্রাজ্যের সীমান্ত এলাকাগুলোকে পরোক্ষভাবে শাসন করার জন্য তৈরি করা হয়েছিল। আশ্চর্যজনকভাবে, এফসিআর-এর নিয়ম ও পদ্ধতিগুলো অধীনস্থ জনসংখ্যার রাজনৈতিক ও নাগরিক অধিকারের দিকে খুব সামান্যই নজর দিয়েছিল। এফসিআর-এর অধীনে, কেন্দ্রীয় সরকারের ইচ্ছানুযায়ী একজন পাকিস্তানি রাজনৈতিক প্রতিনিধি জিবি-র ওপর সংসদীয়, বিচার বিভাগীয়, নির্বাহী এবং রাজস্ব সংক্রান্ত ক্ষমতা প্রয়োগ করত। জিবি-র মানুষ হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল; তার পরিবর্তে মূলত নামমাত্র বা আনুষ্ঠানিক প্রধান আদালতের একটি পদ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল।

পাকিস্তান রাষ্ট্রের যুক্তি অনুযায়ী, তারা যদি জিবি-কে তাদের ফেডারেশনের অংশ করে নেয়; উদাহরণস্বরূপ, একে প্রদেশের মর্যাদা দেয়, তবে কার্যত এর অর্থ দাঁড়াবে যে- পাকিস্তান ভারতের শাসনাধীন কাশ্মীর ভূখণ্ডের ওপর থেকে তাদের দাবি ত্যাগ করেছে। ১৯৬৩ সালে পাকিস্তান ও চীন ‘সাইনো-পাকিস্তান সীমান্ত চুক্তি’-তে সম্মত হয়, যা কারাকোরাম জলপ্রপাত বরাবর এই অঞ্চলের উত্তর সীমানা নির্ধারণ করে; এই অবস্থানটি ‘গ্রেট গেম’-এর সময় ব্রিটিশ ও কাশ্মীর উভয় পক্ষই কমবেশি মেনে নিয়েছিল। ভারত এই সীমান্ত চুক্তির বিরোধিতা করে জানায় যে, এটি ১৯৪৮ এবং ১৯৪৯ সালের জাতিসংঘ প্রস্তাবের পরিপন্থী। ওই প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে—ভারত বা পাকিস্তান কেউই এই অঞ্চলের সীমানা পরিবর্তন করতে পারবে না অথবা একতরফাভাবে এই অঞ্চলের কোনো অংশকে তাদের ফেডারেশনের অন্তর্ভুক্ত করতে পারবে না। পাকিস্তান সরকার দাবি করে যে, এটি কেবল একটি সাময়িক সীমানা এবং কাশ্মীর সমস্যার চূড়ান্ত সমাধান হলে এটি পরিবর্তনের সুযোগ রয়েছে।

১৯৬০-এর দশকে জেনারেল আইয়ুব খানের সামরিক শাসনামলে—দেশের অভ্যন্তরে দরিদ্রবান্ধব সমাজতান্ত্রিক সংস্কার বাস্তবায়নের লক্ষ্যে চলমান বৃহত্তর গণআন্দোলনের অংশ হিসেবে এফসিআর বিলুপ্ত করার জন্য, রাজনৈতিক সচেতন হয়ে ওঠা জিবি-র জনগণের পক্ষ থেকে চাপ সৃষ্টি হয়। এই সময়ে জিবি-র অনেক যুবক পড়াশোনা বা কাজের উদ্দেশ্যে এলাকা ছেড়েছিল। কেউ কেউ লাহোর ও রাওয়ালপিন্ডি শহরে চলে যায়, তবে অধিকাংশেরই গন্তব্য ছিল করাচি; ফলে তৎকালীন পাকিস্তানের শহরগুলোতে দানা বেঁধে ওঠা গণআন্দোলনগুলোর সংস্পর্শে তারা সরাসরি আসে। তাদের অনেকেই জুলফিকার আলী ভুট্টো কর্তৃক ১৯৬৭ সালে প্রতিষ্ঠিত নতুন দল পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি)-এর সক্রিয় সমর্থক হয়ে ওঠে। ১৯৬৭ সালে জনগণের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে ‘গিলগিত জমহুরি মাহাজ’ নামে একটি স্থানীয় রাজনৈতিক দল গঠিত হয়, যা পরবর্তীতে পিপিপি-র সাথে একীভূত হয়ে যায়। ১৯৭২ সালে ‘গিলগিত-বালতিস্তান স্টুডেন্ট ফেডারেশন’ প্রতিষ্ঠিত হয়, যা এই অঞ্চলের জন্য একটি প্রদেশের মর্যাদা আদায়ের রাজনৈতিক দাবিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এসব গণমুখী রাজনীতির ফলে ১৯৭২-১৯৭৪ সালের মধ্যে পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ এফসিআর এবং হুনজা, নগর, স্কার্দু ও খাপলু-র সামন্ততান্ত্রিক রাজ্যগুলো বিলুপ্ত করে এবং সেগুলোর পরিবর্তে একজন করে ডেপুটি কমিশনারের অধীনে পাঁচটি নতুন জেলা গঠন করে। এই পাঁচটি নতুন জেলা ছিল গিলগিত, স্কার্দু, ঘাঞ্চে, ঘিজার এবং দিয়ামির।

 

কারাকোরাম হাইওয়ে এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন : 

১৯৬৩ সালে চীন ও পাকিস্তানের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী ও জটিল সীমান্তের সীমানা নির্ধারণের শান্তিপূর্ণ সমাধান দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক নতুন যুগের সূচনা করে, যা পরবর্তীকালে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়। এই চুক্তির সুদূরপ্রসারী প্রভাব এই অঞ্চলের সমাজের ওপর বিশেষভাবে পরিলক্ষিত হয়। সীমান্ত চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পর, উভয় দেশ ‘বন্ধুত্বপূর্ণ হাইওয়ে’ নির্মাণের বিষয়ে একমত হয়- এমন একটি সড়ক যা একবিংশ শতাব্দীতে চীন ও পাকিস্তানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূ-কৌশলগত তাৎপর্য বহন করে। বন্ধুত্বপূর্ণ হাইওয়ে, যা বর্তমানে কারাকোরাম হাইওয়ে নামে পরিচিত- এটি ১৯৬৬ সালে পাকিস্তান ও চীনের একটি যৌথ প্রকল্প হিসেবে শুরু হয় এবং এটি সম্পন্ন করতে বারো বছর সময় লাগে। সড়কটি খাইবার পাখতুনখোয়ার মানসেরা জেলা থেকে শুরু হয়ে জিবি-র হৃৎপিণ্ডের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়েছে; প্রথমে সিন্ধু উপত্যকা এবং পরে গিলগিত ও হুনজা উপত্যকা দিয়ে। এটি ১৫,৩৯৭ ফুট উচ্চতার খুঞ্জেরাব পাস দিয়ে পাকিস্তান-চীন সীমান্ত অতিক্রম করে কিংবদন্তি সিল্ক রুটের প্রাচীন ক্যারাভান শহর কাশগড়ে (চীনের জিনজিয়াং অঞ্চলের শহর) গিয়ে শেষ হয়েছে। সড়কটি ৭১৫ মাইলেরও বেশি দীর্ঘ এবং এটি বিশ্বের সবচেয়ে দর্শনীয় পর্বতশৃঙ্গ ও ভূ-প্রকৃতির মধ্য দিয়ে চলে গেছে। পাকিস্তানে কারাকোরাম হাইওয়ের মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ৪৯৭ মাইল, যার মধ্যে প্রায় ৩১০ মাইল গিলগিত-বালতিস্তানের মধ্য দিয়ে বিস্তৃত।

কারাকোরাম হাইওয়ে (কেকেএইচ) নির্মাণের ফলে স্থানীয় অর্থনীতিতে দ্রুত পরিবর্তন ও প্রবৃদ্ধি ঘটে, যা মূলত চীন-পাকিস্তান বাণিজ্য ও অনেকাংশে পর্যটন শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। এই সড়কটি স্থানীয় মানুষের জন্য অঞ্চলের বাইরে গিয়ে কর্মসংস্থান এবং শিক্ষা গ্রহণের নতুন সুযোগ তৈরি করে দেয়। সবকিছুর ঊর্ধ্বে, কেকেএইচ সমগ্র অঞ্চলের মধ্যে স্থানীয় মানুষ ও পণ্য চলাচলের পরিধি বাড়িয়ে দেয়, যার ফলে কৃষি ও সংস্কৃতিতে এক আমূল পরিবর্তন আসে। কেকেএইচ-এর আগমনের সাথে সাথে ১৯৮০ এবং ১৯৯০-এর দশকে এই অঞ্চলে উন্নয়ন, সংরক্ষণ ও ত্রাণ সংস্থাগুলোর জোয়ার আসে। গিলগিত-বালতিস্তানের স্থানীয় সমাজ বহিরাগত উন্নয়নমূলক পদক্ষেপে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে; যার ফলে এই অঞ্চলটিকে প্রায়ই সফল ‘কমিউনিটি-ভিত্তিক’ উন্নয়ন, সংরক্ষণ ও ত্রাণ কাজের উদাহরণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। স্থানীয় মানুষকে দারিদ্র্যমুক্ত করতে এবং গ্রামীণ পরিবারগুলোর জীবনধারণ ভিত্তিক অর্থনীতির মানোন্নয়নে ‘আগা খান ডেভেলপমেন্ট নেটওয়ার্ক’-এর মতো ইসমাইলি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর বিনিয়োগ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই নতুন প্রতিষ্ঠানগুলো এই অঞ্চলের ইতিমধ্যেই জটিল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নতুন মাত্রা যোগ করেছে, যেখানে সাধারণ মানুষ বিভিন্ন শক্তির সার্বভৌমত্বের বহুমুখী দাবির সম্মুখীন হচ্ছে।

১৯৮৬ সালে রাস্তাটি বিদেশিদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় এবং তারপর থেকে এটি আন্তর্জাতিক পর্যটকদের ক্রমাগত বৃদ্ধি পেতে থাকা আগমন প্রত্যক্ষ করেছে। ১৯৮০-১৯৯৫ সালের মধ্যে হুনজায় হোটেল বেডের সংখ্যা ১০০ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছিল। ২০১৮ সালে ২০ লক্ষাধিক পর্যটক— যাদের অধিকাংশই পাকিস্তানি, এই অঞ্চলটি ভ্রমণ করে। গিলগিত-বালতিস্তানে সড়ক যোগাযোগের বিস্তার ছিল অত্যন্ত দ্রুত এবং নাটকীয়।

১৯৯৪ সালে পিপিপি-র দ্বিতীয় শাসনামলে, কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভা নর্দার্ন এরিয়াস-এর জন্য ‘লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডার’ নামক একটি সংস্কার প্যাকেজ অনুমোদন করে। প্রথমবারের মতো কেন্দ্রীয় সরকার এই এলাকায় একজন মুখ্য সচিব এবং চারজন সচিব নিয়োগ দেয়। এই প্যাকেজের অধীনে ১৯৯৪ সালেই প্রথমবারের মতো দলীয় ভিত্তিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৯৪ সালের এই সংস্কার প্যাকেজের অর্থ ছিল, প্রথমবারের মতো জিবি-কে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত নিজস্ব আইনসভা নির্বাচনের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। এই সংস্কার সত্ত্বেও, সরকারি বিষয়ের প্রশাসনিক ক্ষমতা নির্বাচিত কাউন্সিল সদস্যদের হাতে না থেকে কাশ্মীর বিষয়ক মন্ত্রীর হাতেই রয়ে গিয়েছিল। অধিকন্তু, এই সংস্কার প্যাকেজটি স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর কোনো পরিবর্তন আনেনি— যেমন পাকিস্তানি জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ ও দেশের সর্বোচ্চ আদালতে যাওয়ার সুযোগের মতো মৌলিক অধিকারের অভাব। এই পরিস্থিতি স্থানীয় জনগণের মধ্যে পাকিস্তানি রাষ্ট্রের প্রতি অবহেলা ও হতাশার অনুভূতি তৈরি করেছে।

১৯৯৯ সালে, নর্দার্ন এরিয়াস-এর জনগণের পক্ষে সুপ্রিম কোর্টে দায়ের করা একটি মামলার চাপে- পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজ (পিএমএল-এন) সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদে এই অঞ্চলের মানুষকে আরও রাজনৈতিক ও আইনি অধিকার প্রদান করা হয়। ‘নর্দার্ন এরিয়াস কাউন্সিল’-কে ক্ষমতায়িত করা হয় ও এর নাম পরিবর্তন করে ‘নর্দার্ন এরিয়াস লেজিসলেটিভ কাউন্সিল’ রাখা হয়। নতুন সংস্কার প্যাকেজের অধীনে এই কাউন্সিলের আকার বৃদ্ধি পায় এবং আইন প্রণয়নযোগ্য বিষয়গুলোর ওপর এর কর্তৃত্বও বাড়ে। তবে, ১৯৯৪ সালের সংস্কার প্যাকেজের মতোই, প্রধান নির্বাহীর পদটি কেন্দ্রীয় কাশ্মীর বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের হাতেই থেকে যায়। প্রকৃতপক্ষে, যদিও নর্দার্ন এরিয়াস লেজিসলেটিভ কাউন্সিল জনগণের দ্বারা নির্বাচিত হয়েছিল, তবুও এর প্রধান ছিলেন এমন একজন ব্যক্তি যিনি নির্বাচিত নন।

২০০৯ সালে পিপিপি সরকার এই অঞ্চলের নাম পরিবর্তন করে ‘গিলগিত-বালতিস্তান’ রাখে এবং অন্যান্য প্রদেশের আদলে আরও কিছু সংস্কার সাধন করে। ২০১৩ সালে আরও কিছু সংস্কার আনা হয় যা ‘গিলগিত-বালতিস্তান লেজিসলেটিভ কাউন্সিল’-এর আইন প্রণয়নের পরিধি বাড়িয়ে একে আরও স্বায়ত্তশাসন প্রদান করে, কিন্তু এটিও সেখানকার জনগণের সন্তুষ্টির জন্য যথেষ্ট ছিল না। ২০১৮ সালে পিএমএল-এন সরকার আরেকটি সংস্কার প্যাকেজ প্রবর্তন করে, যার মাধ্যমে স্থানীয় জনগণের ওপর আয়কর আরোপ করা হয়। এই পদক্ষেপটি স্থানীয়রা ভালোভাবে গ্রহণ করেনি; তারা সতর্ক করে দেয় যে, কেন্দ্রীয় পর্যায়ে প্রতিনিধিত্ব ছাড়া তারা কোনো ধরনের কর দিতে রাজি নয়। ২০১৮ সালের এই সংস্কার প্যাকেজের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া ছিল অত্যন্ত দ্রুত এবং ক্ষুব্ধ, যার ফলে পিএমএল-এন সরকার শীঘ্রই গিলগিত-বালতিস্তানে কর আরোপের পরিকল্পনাটি প্রত্যাহার করে নেয়।

গিলগিত-বালতিস্তানের জনগণের রাজনৈতিক দাবির প্রতি পাকিস্তানি রাষ্ট্রের ইতিবাচক সাড়া দিতে ক্রমাগত ব্যর্থতা সেখানকার মানুষের মধ্যে রাষ্ট্র সম্পর্কে মোহভঙ্গ এবং অবজ্ঞার পরিবেশ তৈরি করেছে। প্রকৃতপক্ষে, অনেক স্থানীয় মানুষ তাদের রাজনৈতিক ইতিহাসকে অত্যন্ত যথার্থভাবে ‘জ্বলন্ত কড়াই থেকে চুলার আগুনে পড়া’ (এক বিপদ থেকে উদ্ধার পেয়ে বড় বিপদে পড়া) হিসেবে বর্ণনা করেছে। ভুট্টোর আমল ছাড়া, এই অঞ্চলের ওপর পাকিস্তানি রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের অন্য সব সময়কালকে সাধারণ মানুষ অবৈধ ও বেআইনি হিসেবেই গণ্য করে। বিশেষ করে জেনারেল জিয়াকে এই অঞ্চলে জাতিগত ও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা উসকে দেওয়ার জন্য দায়ী করা হয়। স্থানীয়দের দাবি, তিনি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এই কাজ করেছিলেন যাতে জিবির মানুষ পাকিস্তানি সরকারের অবৈধ আধিপত্যের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে না পারে।

পাকিস্তানে জিবির আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তির অভাব থাকা সত্ত্বেও, অন্যান্য ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অন্তর্ভুক্তি লক্ষ করা যায়, যার কিছু কিছু স্বাগতম জানালেও অন্যগুলো নিয়ে আপত্তি রয়েছে। পাকিস্তানের বেসামরিক ও সামরিক উভয় প্রতিষ্ঠানই জিবিতে তাদের উপস্থিতি বজায় রেখেছে। অনির্দিষ্টকালের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে স্থানীয় জনগণের মধ্যে যে মোহভঙ্গ তৈরি হয়েছে, তা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি অবজ্ঞা সৃষ্টি করেছে এবং তাত্ত্বিক স্তরে তাদের বৈধতাকে দুর্বল করেছে। পাকিস্তানি রাষ্ট্রের ভেতরে নিজেদের অনিশ্চিত রাজনৈতিক অবস্থানকে স্থানীয়রা প্রায়ই ‘ভালোবাসা ও বিশ্বাসঘাতকতার’ রূপক দিয়ে ব্যাখ্যা করে থাকে। যদিও সম্পদের অভাবে জিবিতে বেসামরিক আমলাতন্ত্র দুর্বল, তবুও এর কাঠামো অন্য প্রদেশগুলোর মতোই। এখানকার ৯৫ শতাংশেরও বেশি আমলা স্থানীয়। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি এই এলাকায় অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসে ‘আগা খান ডেভেলপমেন্ট নেটওয়ার্ক’-এর আগমনের মাধ্যমে। এটি বহু মিলিয়ন ডলারের একটি বহুমুখী প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম, যা তৃণমূল পর্যায়ের সংগঠনের মাধ্যমে স্থানীয় জনপদগুলোতে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নমূলক সম্পদ সরবরাহ করেছে। ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে ‘আগা খান রুরাল সাপোর্ট প্রোগ্রাম’ ছিল একটি অগ্রগামী গ্রামীণ উন্নয়ন প্রকল্প।

জিবি-কে বৃহত্তর পাকিস্তানি জাতিরাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত করার অন্যান্য কিছু প্রক্রিয়া বেশ বিতর্কিত হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- কেন্দ্রীয় সরকারের শিক্ষাক্রম চাপিয়ে দেওয়া, যা কেবল রাষ্ট্র-পৃষ্ঠপোষকতায় তৈরি জাতীয় ইতিহাসের সংস্করণই শেখায় না, বরং এটি উর্দুর মাধ্যমে শেখানো বাধ্যতামূলক করে; যে ভাষাটি জিবির মানুষের কাছে একটি বিদেশি ভাষা। তদুপরি, ১৯৮০-র দশকে জিয়ার সামরিক শাসনামলে পাকিস্তান সরকার ‘ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ হিস্টোরিকাল অ্যান্ড কালচারাল রিসার্চ’ থেকে প্রকাশিত ‘দ্য হিস্ট্রি অফ নর্দার্ন এরিয়াস’ নামক একটি বিশাল গ্রন্থ তৈরির দায়িত্ব দেয়। এই গ্রন্থে সাধারণ মুসলিম পরিচয়ের ভিত্তিতে পাকিস্তানের সাথে জিবির ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ঘনিষ্ঠতার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় ইতিহাসের এই ইসলামিকরণ, যেখানে স্থানীয় মুসলিম জনগোষ্ঠী এবং পূর্বতন হিন্দু ডোগরা শাসকের মধ্যকার সংগ্রামের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, তার নেপথ্যে দ্বি-জাতিতত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে একটি জাতীয়তাবাদী প্রকল্পের প্রভাব রয়েছে।

বর্তমানে, জিবি সড়ক ও আকাশপথে ইসলামাবাদ এবং পাকিস্তানের অন্যান্য অঞ্চলের সাথে ভৌগোলিকভাবে যুক্ত। ১৯৩০-এর দশক থেকেই গিলগিত ও ইসলামাবাদের মধ্যে বিমান যোগাযোগ রয়েছে, যা সময়ের সাথে সাথে অনেক উন্নত হয়েছে। একবিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে যোগাযোগ ব্যবস্থার নাটকীয় উন্নতি ঘটেছে; জিবির উদীয়মান বাণিজ্যিক শহরগুলোতে ডিজিটাল টেলিফোন ব্যবস্থা রয়েছে ও সেলুলার ফোন পরিষেবাও সহজলভ্য করা হয়েছে। ২০০০-এর দশকের শুরুর দিকে জিবির ইন্টারনেট সংযোগ ফাইবার অপটিক্সের মাধ্যমে ২জি হাই-স্পিডে উন্নীত করা হয়েছিল, তবে তারপর থেকে এটি অপরিবর্তিত রয়েছে। ২০১৩ সাল থেকে, ‘চীন-পাকিস্তান ইকোনোমিক করিডোর’ (সিপেক) নামক পাকিস্তানে মাল্টি-বিলিয়ন ডলারের চীনা বিনিয়োগের অংশ হিসেবে যান চলাচল ও বাণিজ্য বৃদ্ধির লক্ষ্যে রাস্তাটির আধুনিকীকরণ করা হচ্ছে। এই অর্থনৈতিক করিডোরে জিবির বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং পাকিস্তানের অন্যান্য অংশসহ চীন ও পাকিস্তানের মধ্যে সড়ক ও রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত থাকবে। সিপেক চীনকে পাকিস্তানের মূল ভূখণ্ডের মধ্য দিয়ে অনেক সংক্ষিপ্ত পথে বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য ভারত মহাসাগরের উষ্ণ জলরাশিতে পৌঁছানোর সুযোগ করে দেবে। কেউ কেউ আশা করছে যে, যেহেতু চীন এই অঞ্চলে এত বিপুল বিনিয়োগ করছে, তাই তারা চাইবে পাকিস্তান এই অঞ্চলের রাজনৈতিক মর্যাদার বিষয়ে একটি স্পষ্ট ঘোষণা দিক—সম্ভবত একটি অস্থায়ী প্রাদেশিক মর্যাদা। এই নতুন চীনা বিনিয়োগ কি জিবির প্রতি এবং পুরো কাশ্মীর ইস্যুতে পাকিস্তানকে তার নীতি পরিবর্তনে বাধ্য করবে? জিবির জনগণ কি তাদের রাজনৈতিক মর্যাদার একটি চূড়ান্ত সমাধান পাবে, নাকি তারা অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে আরও প্রান্তিক হয়ে পড়বে? কেবল ইতিহাসই তা বলে দেবে!

বিজ্ঞাপন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments