সতীত্বের তেজ

আমিন আশরাফ

অর্ধেক পৃথিবীর শাসনকেন্দ্র মহানগরী বাগদাদ—সময়ের সুন্দরতম এক শহরের নাম। যার রূপ-লাবণ্যের প্রতি কাল্পনিক গ্রিক দেব-দেবীরাও ঈর্ষাকাতর হয়ে যেত; যে শহরের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সৌন্দর্য বর্ণনায় লেখা হয়েছে হাজার-লক্ষ পৃষ্ঠা। এ শহরের পরাক্রমশালী আব্বাসীয় খলিফা আল মামুন। তিনি শুধু খলিফাই ছিলেন না; ছিলেন প্রজ্ঞাবান, শিক্ষাবিদ, সমরবিদ, অনুবাদক ও একজন সংস্কারক।

তাঁর ছেলে আব্বাস—আব্বাসীয় পৃথিবীর যুবরাজ, যাঁর শিরা-উপশিরায় রাজকীয় রক্ত টগবগ করছে। তিনি যাচ্ছেন শিকারে। রাজপ্রাসাদে সবার মাঝে একপ্রকার চঞ্চলতা তৈরি হলো। আব্বাসের ইয়ার-দোস্ত ও অনুচরগণ সংবাদ পাওয়া মাত্রই শিকারের পোশাক, তীর-ধনুক, জ্যা, বল্লম ও সড়কি নিয়ে যুদ্ধসাজে হাজির হলেন। রাজকীয় বহর নিয়ে শাহজাদা রাজপ্রাসাদ ত্যাগ করলেন হরিণ শিকারের দুরন্ত মহোৎসবে। সঙ্গে আছে ডগ স্কোয়াড, প্রশিক্ষিত বাজপাখিসহ বিশাল এক সৈন্যদল।

আজ শাহজাদা আব্বাস অনেক খুশি। পৃথিবীর রাজা-মহারাজাদের জন্য এ আর এমন নতুন কী ঘটনা, যা নিয়ে গল্প ফাঁদতে হবে? তা বলতে পারেন; তবে আমি আপনাদের কাছে শিকারের ঘটনা বলতে আসিনি, বলতে এসেছি অন্য কাহিনি, যা তৎকালীন পৃথিবীসহ এখন পর্যন্ত পৃথিবীর মানুষের কাছে বিস্ময় হয়ে আছে। তবে চলুন না, শুনি সে ঘটনা।

আব্বাস শিকারের সব আয়োজন নিয়ে রওনা হয়েছেন। দিগন্তের ধূলিঝড় উড়িয়ে তাঁর ঘোড়া উল্কাবেগে ছুটে চলছে। জগতের সব আনন্দ আজ তাঁর চোখ-মুখে ছুঁয়ে যাচ্ছে। মানুষমাত্রই বিনোদনপ্রিয়; আব্বাস খলিফাপুত্র হলেও এর বাইরে তো নন। তাকে দেখে যে কেউ বলতে বাধ্য হবে- বাদশাহপুত্র এমনই হওয়া উচিত। আব্বাসের আজ কী হলো, সে নিজেও বুঝতে পারছে না। ঘোড়ার ওপর মাত্রাতিরিক্ত চাবুক প্রয়োগ করতে লাগলেন। ঘোড়াও যেন আজ আঘাতে আঘাতে বোরাকে পরিণত হওয়ার চেষ্টা করছে। হয়তো বা রূপকথার উড়ন্ত ঘোড়ার মতো সে ছুটছে জগতের সব ধুলোকে আকাশে উড়িয়ে দেওয়ার প্রতিজ্ঞা নিয়ে।

এক সময় ঘোড়সওয়ারের চেতনা ফিরে আসে। বুঝতে পারেন, তিনি দুলদুল নিয়ে দলছুট অশ্বারোহী হয়ে গেছেন। সবাইকে পেছনে রেখে অনেক অনেক দূর এগিয়ে এসেছেন। এক্ষণে ঘোড়া থামিয়ে তাঁর সঙ্গীদের জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনো গতি নেই। কিন্তু তিনি তাঁর ঘোড়া থামাতে পারছেন না। রাগী ঘোড়া যেন আজ তার মনিবকে থোড়াই কেয়ার করছে। তার বোবা মন বলছে—আজ তোমাকে আমার রাজকীয় গতি দেখিয়ে ছাড়ব। শাহজাদা হয়রান হয়ে গেলেন। ঘোড়ার বাগডোর নিয়ন্ত্রণ করার ব্যর্থ চেষ্টা করছেন। কিন্তু কাজ হচ্ছে না দেখে আব্বাস ঘোড়ার ওপরই তাঁর ভাগ্য সঁপে দিলেন। ঘোড়া ছুটতে ছুটতে অবশেষে এক খরস্রোতা নদীর তীরে এসে দম ফেলল।

ক্লান্তপ্রাণ শাহজাদা ঘোড়া থেকে নেমে দাঁড়ালেন। নদীর তীরে দাঁড়িয়ে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছিলেন। একটু জিরিয়ে নেওয়ার জন্য যুতসই, আরামদায়ক ও ছায়াশীতল জায়গা খুঁজছেন। একসময় তাঁর সুন্দর চেহারায় আলো ঝলমল করে উঠল। আব্বাস অনতিদূরে একটা ছোট ঘর দেখতে পান। তিনি ঘোড়ার লাগাম হাতে নিয়ে সেদিকে হাঁটতে লাগলেন। হাঁটতে হাঁটতে যেন তিনি আরও ক্লান্ত হয়ে পড়ছেন। অনেক কষ্টে সেই ঘরটির সামনে উপস্থিত হয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন। কিন্তু এখানে যেন রাজ্যের নীরবতা; কোথাও কেউ নেই। যেন শূন্যতার এক মহাপ্রাচীর তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে আছে। মাঝে মাঝে বাতাসের শো-শো শব্দ তাঁর কানে গুঞ্জন করে ফিরছে। তিনি বুকের ভেতর যেন তাঁর সমস্ত শক্তি এক করে বললেন—‘বাড়িতে কেউ আছেন? আমি একজন ক্লান্ত পথিক। আমাকে কি একটু ঠাঁই দেবেন?

কিন্তু পর্ণকুটিরে তাঁর কথার উত্তর দেওয়ার মতো কোনো পুরুষ ছিল না। ছিল লজ্জার পিরামিড এক বিধবা যুবতী নারী ও তার দুগ্ধপোষ্য এক শিশু। সে তার ছোট্ট শিশুকে নিয়ে এখানে বসবাস করছে। শাহজাদার কণ্ঠ আবারও উচ্চকিত হলো। নারীটি ঘরের ছোট জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখে—এক রাজপুত্র রাজ্যের সব সৌন্দর্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তাঁর চেহারায় ক্লান্তির ছাপ সুস্পষ্ট; চেহারাটায় যেন একটা মায়া ঝুলে আছে। এবার তার দয়া হলো। এই নির্জন প্রান্তরে যুবকটির উপস্থিতি সেই নারীর মনে কিছুটা ভয় চেপে বসালেও, যুবকটির চেহারা দেখে সে কিছুটা সদয় হলো। নারীর মন দয়া-মায়ার এক অন্য ভুবন। ভয়কে দূরে ঠেলে সে এবার ঘর থেকে যুবকটিকে বলল, ‘জনাব, আপনি ঘোড়াটাকে একটা গাছের সঙ্গে বেঁধে দয়া করে ভেতরে তশরিফ আনুন।’

বেশ শ্রান্ত আব্বাস ঘোড়াটাকে কোনো রকম একটা গাছের সাথে আটকে ঘরে প্রবেশ করলেন। বিধবা নারীটি তার শিশুটিকে কোলে নিয়ে যুবককে অনুরোধ করল, জনাব, আপনি দয়া করে আমার জীর্ণ বিছানায় একটু আরাম করুন। বিধবা নারীটি আব্বাসকে ঠান্ডা শরবত তৈরি করে দিল। শরবত পান করে আব্বাসের ক্লান্তি এক নিমিষেই দূর হয়ে গেল। মনের ভেতর যেন শিকারে বের হওয়ার আনন্দ বুদবুদ করে উঠল। এবার সে নারীর ওপর গভীর দৃষ্টি নিক্ষেপ করল। শরবত পান করার পর সে এদিক-ওদিক দৃষ্টি দেওয়ার শক্তি ফিরে পায়। মেয়েটির দিকে তাকানোর পর তার ভেতর একপ্রকার বিদ্যুৎ খেলে গেল। এমন অনিন্দ্য সুন্দরী সে এর আগে কোনোদিন দেখেনি। রাজপ্রাসাদের এই যুবক চোখ ফেরাতে পারছিল না। বিধবা নারীটিকে দেখে সে স্থান-কাল-পাত্র ভুলে গেল। ভুলে গেল সে মহাশক্তিধর একজন ন্যায়পরায়ণ বাদশাহের ছেলে, যে শক্তিমান বাদশাহ শুধু অর্ধেক পৃথিবীই শাসন করেন না, ইনসাফ প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি নারীদের সর্বোচ্চ মর্যাদা সুনিশ্চিত করেছেন। নারী এক রহস্যের নাম, যারা মানুষের চোখের মতো সংবেদনশীল। তারা ধেয়ে আসা বিপদ সহজে আঁচ করে ফেলতে পারে। শাহজাদার তাকানোর ধরন দেখে নারীর মন কু-ডাক দিয়ে উঠল; এ সময় সে নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা করল।

এই সময় আব্বাস তাকে জিজ্ঞেস করলেন—আপনার স্বামী কোথায়? স্বামীর কথা বলতেই মেয়েটি তার দুঃখের কাহিনি বলে গেল। বলে গেল এই অভাবের সংসারে স্বামী তাকে কীভাবে একা রেখে মহান আল্লাহর কাছে চলে গেছেন। অনেক কষ্ট করে সে তার বাচ্চাটাকে নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। মেয়েটির দুঃখের কাহিনি শুনে আব্বাসের ভেতর সহানুভূতির প্রকাশের বদলে একটা শয়তানি চিন্তা মাথায় কিলবিল করে উঠল। তার সাহস বেড়ে গেল। নৈতিকতা ভুলে সে বিধবা সুন্দরী নারীকে বলল—যদি আমার ইচ্ছাপূরণ করো, তবে তুমি অনেক সম্পদের মালিক হয়ে যাবে। অর্ধেক পৃথিবীর কর্তা আমার বাবা। আমার ডায়েরিতে দুঃখ বলতে কোনো শব্দ নেই, অভাব নামের কোনো বাক্য তাতে লেখা নেই। তুমি চাইলে মুহূর্তেই এই ছনের ঘর একটা চমৎকার প্রাসাদে পরিণত করে দেবো। তাহলে রক্ষিতা হতে তোমার ভয় কিসের? শাহজাদা মেয়েটির রূপে যেন সবকিছু ভুলে গিয়ে তাকে নিজের বাগে আনার জন্য যা বলার দরকার সবই বলতে লাগল। এমন কোনো প্রলোভন নেই যে সে প্রয়োগ করল না।

আব্বাসের কথা শেষ হলে মেয়েটি বলল—শাহজাদা, মহান আল্লাহ কুরআনুল কারিমে পাপকাজ থেকে বিরত থাকতে কঠোরভাবে নির্দেশ দিয়েছেন। খলিফা মামুনের মতো ন্যায়পরায়ণ ও আল্লাহপ্রেমিক খলিফার ছেলে হয়ে আপনি আমাকে এমন জঘন্য প্রস্তাব দিতে পারলেন? আপনার মধ্যে কি বিন্দুমাত্র আল্লাহর ভয় নেই? আপনি কি এতটাই নির্লজ্জ যে, আপনাকে যে আশ্রয় দিয়েছে খোদ তারই ইজ্জতের ওপর হামলে পড়তে চান? যদি ভালো চান, তবে মনের কালিমা দূর করে ফেলুন, আল্লাহর কাছে তওবা করুন এবং আমার কাছ থেকে এক্ষুনি চলে যান। আপনার মতো এমন নরপিশাচের চেহারাও আমি দেখতে চাই না। কথাগুলো বলতে বলতে যেন মেয়েটির চেহারায় এক অজানা সাহস এসে ভর করল। বিধবা নারীটি যেন একজন রণযোদ্ধায় পরিণত হয়েছে। কিন্তু শয়তান ভর করা আব্বাসের রাজকীয় মনে এসব কথায় কোনো প্রভাব পড়ল না। সে মেয়েটির কথায় পাত্তা না দিয়ে তার দিকে হাত বাড়াল। মেয়েটি কোনো উপায় না দেখে দৌড়ে ঘর থেকে বের হয়ে নদীর দিকে দৌড়াতে লাগল। আব্বাসও তার পিছু তাড়া করে মেয়েটির কাছে চলে এল এবং তার হাত চেপে ধরল। নারীটি নিজের প্রাণ বাঁচাতে আব্বাসের গলা দুহাতে চেপে ধরে। আব্বাসীয় খলিফাপুত্র এবার মাটিতে পড়ে গেল। নারীটি তবুও আব্বাসের গলা ছাড়ল না। শ্বাসরুদ্ধ হয়ে এবার আব্বাসের মারা যাওয়ার উপক্রম হলো। সহসা খুব কাছে ঘোড়ার হ্রেষারব শোনা গেল। রাজ্যের ধূলিঝড় উড়িয়ে একদল অশ্বারোহী নদীর তীরের দিকে এগিয়ে আসছে। মেয়েটি এবার আব্বাসের গলা ছাড়ল। আব্বাস গা ঝাড়তে ঝাড়তে উঠে দাঁড়াল। এই সময় আব্বাসের লোকজন তাকে ঘিরে দাঁড়াল। তারা আব্বাসকে পেয়ে অনেক খুশি হলো। এরপর তারা শিকার করতে চলে গেল।

 

দুই,

গহীন অরণ্যে শিকার করার আনন্দের কথা তো সেই জানে, যে শিকার করার মজা একবার পেয়েছে। কিন্তু আব্বাস শিকার করতে গিয়ে আজ অনেক ভুল করছিল। বারবার তার তীর লক্ষ্যভ্রষ্ট হচ্ছিল; অথচ সে একজন দক্ষ তীরন্দাজ, রাজপ্রাসাদের প্রধান তীরন্দাজ তাকে তীর চালানো শিখিয়েছে। হরিণ সামনে পেয়েও কোনোভাবে ঘায়েল করতে পারছিল না। রাগ যেন তার ওপর হায়েনার মতো চেপে বসেছে। রাগে মাথার সবগুলো চুল ছিঁড়ে ফেলতে ইচ্ছে করছে তার। সে একজন খলিফার পুত্র; খলিফাপুত্রকে একজন সামান্য বিধবা নারী অপমান করেছে, সে কীভাবে এটা মানতে পারে? অথচ তার সামান্য ইশারায় হাজারো দাসী-বাদী ও বাগদাদের রূপসী নারীরা তার পায়ে নিজেদের বিসর্জন দিতে প্রস্তুত থাকে। তার সঙ্গী ও বন্ধু-বান্ধবদের কাছে আব্বাসকে আজ অন্য রকম লাগছে, কিন্তু ভয়ে কেউ কিছু জিজ্ঞেস করার সাহস করতে পারছে না। কোনো রকমে কয়েকটা পশু শিকার করে শাহজাদা খুব কম সময়ে তার দলবল নিয়ে রাজধানীতে ফিরে এল।

এসেই সে বিধবা নারীর ছোট ঘরটি ভেঙেচুরে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়ার আদেশ জারি করল। বিনাদোষে মেয়েটি তার দুধের শিশুটিকে নিয়ে ঘরছাড়া হলো। রাজরোষে পড়ে সে আজ পথের ফকির। স্বামীহারা এই বিধবা নারী এখন কোথায় যাবে, কার কাছে বিচার চাইবে—বুঝতে পারছে না। কারণ, রক্ষকই যদি ভক্ষক হয়, তখন প্রজার করার কী থাকে! এসব করে আব্বাসের মন কিছুটা হলেও শান্ত হলো। সে একজন অমিততেজা নারীকে শাস্তি দিতে পেরেছে, তার সতীত্বের তেজ কিছুটা হলেও পানি করে দিতে পেরেছে—এটাই মনে হলো তার কাছে একটা বড় শিকারের আনন্দের মতো। শিকারে মজা না পেলেও, বিধবা নারীটিকে পথের ফকির করে হলেও একটা পাশবিক সুখ অনুভব করতে লাগল সে।

কিন্তু মেয়েটি যেন হতাশ হওয়ার কোনো পথ অবলম্বন করতে রাজি নয়। সে বাচ্চাটিকে কোলে নিয়ে রাজদরবারে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিল। বিধবা নারী যেন এক সুরম্য ফুলসম বিস্ফোরকের নাম—কখনও সে কোমলময়ী মা, কখনও প্রেমময় স্ত্রী, কখনও বা সে বীরাঙ্গনা খাওলার মানসকন্যা।

 

তিন,

খলিফা আল মামুন রাজদরবারে বসে আছেন। নিয়মমাফিক পদাধিকারবলে মন্ত্রী-আমলারা আগে-পরে আসন গ্রহণ করেছেন। অনেকেই কুর্নিশের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়েছেন। তিনি রাজকার্য পরিচালনায় বিশেষভাবে মগ্ন হয়ে আছেন। এই সময় সেই নারী একটা বাচ্চা কোলে নিয়ে বাদশাহর দরবারে উপস্থিত হলো। তাকে বেশ তেজস্বী ভঙ্গিতে দেখা গেল। দরবারকক্ষে প্রবেশ করার সময় রাজরক্ষীরা তাকে আটকানোর চেষ্টা করেছিল, কিন্তু সে যেন এক্ষণে একজন বীরাঙ্গনা নারীতে পরিণত হয়েছে; পৃথিবীর কারও সাধ্য নেই যে তাকে দরবারকক্ষে যেতে বাধা দেয়। মেয়েটি প্রথামাফিক বাদশাহকে কোনো ধরনের সম্মান না জানিয়ে সামনে এসে দাঁড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল, বাদশাহ নামদার, একজনের লালসার বেদিতে মাথা না রাখার কারণে এবং নিজের সতীত্ব বিসর্জন দিতে রাজি না হওয়ায় এক বিধবার জীর্ণ কুটির আব্বাসীয় খলিফা সরকার বাজেয়াপ্ত করেছে। আমার ওপর যে অবিচার হয়েছে, তার জন্য এখনই ন্যায়বিচার চাই! অন্যথায় আমি মহান আল্লাহর কাছে মহাবিচার দিবসে আপনাদের সবার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবো। একজন বিধবার এই দৃঢ়চেতা অভিযোগ শুনে খলিফা আল মামুন বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলেন। কিছুক্ষণ পর্যন্ত তিনি কোনো কথা বলতে পারলেন না। একটু পর বললেন, “কোন সে কাপুরুষ যে তোমার ওপর এমন অত্যাচার করেছে? তার নাম শুনতে চাই।” শাহজাদা খলিফার কাছেই ছিলেন; নারীটি কিছুক্ষণ নতমুখে থেকে আব্বাসের দিকে আঙুল দিয়ে ইশারা করে বলল, যুবরাজ আব্বাস।

ন্যায়বিচারের জন্য খলিফা আল মামুনের সুনাম সারাবিশ্বে সমাদৃত। বিধবা মেয়েটির অভিযোগ শুনে খলিফা বড় ধরনের একটা ধাক্কা খেলেন। এবার অবাক হওয়ার পালা সবার। লজ্জায়, রাগে ও ক্ষোভে খলিফার মুখ লাল হয়ে গেল। তিনি দেরি না করে আব্বাসকে আদেশ করলেন অভিযোগকারী নারীটির পাশে গিয়ে দাঁড়াতে। তিনি বিচারক, মেয়েটি অভিযোগকারী আর আব্বাস অপরাধী; বিচারকের সামনে আসামি ও বাদীর মধ্যে ব্যক্তিগত সম্পর্কের কোনো পার্থক্য থাকুক, তা তিনি কোনোভাবেই চান না। অপরাধী হিসেবে মেয়েটির পাশে গিয়ে দাঁড়াতে আব্বাসের সাহস হচ্ছিল না; কিন্তু খলিফার ক্ষোভের দৃষ্টি অগ্রাহ্য করার সাহসও সে পেল না। শাহজাদা কিছুটা ইতস্তত করার পর বাদীর পাশে গিয়ে দাঁড়ালেও, সাহস করে আত্মপক্ষ সমর্থন করে কোনো কিছু বলতে পারল না। সে অপরাধ অস্বীকার করার চেষ্টা করল বটে, কিন্তু তার কণ্ঠ আটকে গেল। আব্বাস ভয়ে কাঁপতে লাগল; তার সেই কাঁপুনিটাই বাদশাহের কাছে তার অপরাধ প্রমাণ করতে সাহায্য করল।

অপরাধ অস্বীকার করতে দেখে মেয়েটি রাগে আবারও উত্তেজিত হয়ে বলে উঠল—আপনি খলিফাপুত্র এবং এই রাজ্যের ভবিষ্যৎ বাদশাহ; আপনি নিজের অবস্থান ও কর্তব্য ভুলে এক প্রজার স্ত্রীর ইজ্জত-আব্রু নিলাম করতে গিয়ে ভীষণ অন্যায় করেছেন। এখন আবার সেই অপরাধ অস্বীকার করে পাপের বোঝা আরও বাড়িয়ে নিচ্ছেন। আপনি কতটা দুঃসাহসী আচরণ করেছেন ভেবে দেখেছেন? সেদিন আপনি ক্লান্ত পথিক হয়ে আমার ঘরে ঢুকে জিরিয়ে প্রশান্ত হয়েছেন, আর পরক্ষণেই আমার সঙ্গে অন্যায় করার চেষ্টা করেছেন; আমার ইজ্জত নষ্ট করার অপচেষ্টা করেছেন। আমি নিজেকে আপনার মতো শয়তানরূপী লোকের হাত থেকে বাঁচাতে ঘর থেকে বের হয়ে নদীর তীরের দিকে ছুটে গেলে, আপনি সে পর্যন্ত আমাকে ধাওয়া করে আমার গায়ে হাত দিতেও দ্বিধা করেননি। কিন্তু আল্লাহর রহমতে আপনার কুবাসনা চরিতার্থ করতে পারেননি; আমি গলা চেপে ধরে আপনাকে কাবু করে ফেলেছিলাম। যদি সে সময় আপনার সঙ্গীরা সেখানে উপস্থিত না হতো, তবে আজ আমাকে এই ভরা দরবারে বিচার নিয়ে আসতে হতো না। আমি আপনার দুহাত বেঁধে আমার ঘরে ফেলে রাখতাম; আপনাকে আমার কাছ থেকে মুক্ত করতে খোদ খলিফাকে আমার ঘরে আসতে হতো! কী অবাক কাণ্ড, এমন জঘন্য কর্মকাণ্ড করেও আপনি দিব্যি সবকিছু অস্বীকার করে এখানে নির্লজ্জের মতো দাঁড়িয়ে আছেন? এতেও আপনার তৃপ্তি আসেনি? এরপর আপনি আমার ভাঙা কুঠিরও সরকারের লোকজনের মাধ্যমে বাজেয়াপ্ত করিয়েছেন। আমি বলতে চাই—আপনি কোন সাহসে এমন কাজ করেছেন? আপনি জানেন না যে আমি বারামাকিয়া বংশের কন্যা? আব্বাসীয়রা বারামাকিয়াদের ধ্বংস করতে সমর্থ হলেও, তাদের মেয়েরা এখনও কারও কামনার আগুন নিভানোর মতো চরিত্রহীনা হয়নি। সতীত্ব তাদের কাছে এতটাই মূল্যবান যে, শুধু এটা রক্ষার জন্য সমগ্র আব্বাসীয় সাম্রাজ্য ত্যাগ করতেও তারা কুণ্ঠিত নয়। এতটা সাহস ও দৃঢ়তা নিয়ে মুগিরা নামের মেয়েটি আব্বাসকে লক্ষ্য করে তার অপরাধ সম্পর্কে যেসব কথা বলল, তাতে আব্বাসের অপরাধ সম্পর্কে খলিফার মনে আর কোনো সন্দেহ রইল না। মেয়েটির এই দুঃসাহসিক কথাবার্তা বাদশাহর মন্ত্রী-আমলাদের পছন্দ হলো না। তাদের একজন বিধবা নারীটিকে লক্ষ্য করে বলল, আপনি ভদ্র ভাষায় কথা বলুন। আপনাকে চরম অভদ্র মনে হচ্ছে। খলিফা তাকে থামিয়ে দিলেন এবং বললেন, মেয়েটি যা বলতে চাচ্ছে, তা তাকে বলতে দিন। এমন কথা বলার অধিকার তার আছে, কারণ তার কথায় সত্যতা ফুটে উঠছে। খলিফা এবার আব্বাসের দিকে নজর দিলেন। বললেন, তুমি যে অপরাধী, তাতে আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। তোমার অপরাধ গুরুতর। তুমি এই বিধবা মেয়েটির সর্বনাশ করতে চেয়েছ; তাতে ব্যর্থ হয়ে অযথাই মেয়েটির ঘরবাড়ি ও সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেছ, তাকে গৃহহীন করেছ। তোমার অপরাধ খুবই জঘন্য। তুমি ভাববে না যে রাজপুত্র বলে আমি তোমাকে ক্ষমা করে দেব। অপরাধ যত বেশি, শাস্তিও তত ভয়াবহ। শাস্তির কথা ভেবে আব্বাস ভয়ে কাঁপতে লাগল। মন্ত্রী-আমলাগণ যুবরাজের এই ভীষণ বিপদে অনেক ভয় পেয়ে গেলেন। তাঁরা মুগিরাকে অনুরোধ করতে লাগলেন যেন সে আব্বাসকে ক্ষমা করে দেয়। সবার ব্যাকুল অনুরোধ শুনে দয়াবতী নারীর মনও একেবারে গলে গেল। নিজে অত্যাচারিত, শ্লীলতাহানির শিকার এবং ঘরছাড়া হলেও, অগত্যা সে শাহজাদাকে দয়াপরবশ হয়ে বিনাশর্তে ক্ষমা করে দিল। উজির ও মন্ত্রী-আমলারাও মুগিরার এই মহানুভবতা দেখে তার ভূয়সী প্রশংসা করতে লাগলেন। খলিফা নিজেও ভীষণ আশ্চর্য হয়ে গেলেন—এই তেজী মেয়েটি কতটা সাহসী ও উদার! তিনি বিধবা নারী মুগিরার ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে গেলেন এবং তাকে ধন্যবাদ দেওয়ার ভাষা খুঁজে পেলেন না। তারপর মহামান্য খলিফার আদেশে তার ঘর তাকে ফিরিয়ে দেওয়া হলো। এ ছাড়াও রাজধানী বাগদাদে তাকে একটি প্রাসাদ ও পাঁচটি বড় স্বর্ণমুদ্রার থলে উপহার দেওয়া হলো। বিচার-আচার শেষ হলেও খলিফা মামুন মেয়েটির তেজ ও সাহস দেখে অভিভূত হয়ে রইলেন। তিনি ভাবতে লাগলেন—বিধবা নারীটি এত সাহস কোথা থেকে পেল? অর্ধেক পৃথিবীর বাদশাহর দরবারে এসে তাকে কোনো রকম তোয়াজ না করে স্বয়ং বাদশাহকেই পরকালের ভয় দেখাতে পারে! তাও দরিদ্র ঘরের সামান্য একটা মেয়ে! বাদশাহর সামনেই বাদশাহর ছেলেকে তিরস্কার করতে পারে, তাচ্ছিল্যের ভাষায় কথা বলতে পারে, দিতে পারে সাহসী চ্যালেঞ্জ! তখন কেন যেন খলিফার ভেতর থেকে কেউ বলে উঠল—এ আর কিছু নয়, এটাই পৃথিবীর আত্মসম্ভ্রমবোধসম্পন্ন নারীর আসল রূপ; এটাই নারীর সতীত্বের তেজ!

বিজ্ঞাপন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments