“মুসলিমদের পয়লা সংকট মূলত তাত্ত্বিক এবং নৈতিক; বস্তুগত চ্যালেঞ্জ থাকলেও তা তুলনামূলকভাবে লঘু। আমরা বিচিত্র চিন্তাধারা ও তত্ত্বে ঘেরা এক ‘তীহ’ প্রান্তরে দিগ্বিদিক ছুটছি। এই তীহ ময়দান থেকে বের হওয়ার পথ আমাদের জানা নেই। আজনবি সভ্যতা থেকে আমাদের সমাজে এত বেশি তত্ত্ব ও ধারণার আমদানি হয়েছে যে, আমরা রীতিমতো খেই হারিয়ে ফেলেছি। পশ্চিম থেকে আমদানিকৃত ধারণাগুলোই পুরোপুরি জানার সুযোগ আমাদের হয়নি, প্রয়োগ তো দূরের কথা! কাজেই, মুসলিমরা যতদিন নয়া তত্ত্ব ও ধারণা নির্মাণ, অথবা অন্যদের তত্ত্ব বিনির্মাণ ও পুনর্নির্মাণের কাজ সম্পন্ন করবে না, ততদিন এই তীহ ময়দান থেকে মুক্তির কোনো আশা নেই।” — তহা আবদুর রহমান, রুহুল হাদাসাহ, পৃ. ১১
এক
তহা আবদুর রহমানের সমগ্র ভাবজগৎ জুড়ে দেখা যায় নির্মাণ ও পুনর্নির্মাণের গভীর ছাপ। একরোখা তাকলিদকে তিনি দেখেছেন গোড়ার মুসিবত হিসেবে। আধুনিক পশ্চিমের অনুকরণ করেই তো শুরাব্যবস্থাকে গণতন্ত্র বলার চেষ্টা চলছে। উম্মাহর ধারণা রূপান্তরিত হচ্ছে রাষ্ট্রের (State) ধারণায়। কেউ সুদকে ‘ইন্টারেস্ট’ বলে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলছে। এভাবে ধীরে ধীরে স্বকীয় ও ঐতিহ্যগ্রথিত ধারণাগুলোকে স্রেফ নকলকৃত ধারণার স্তরে নামিয়ে আনা হয়েছে। পরিশেষে মৌলিক ধারণাগুলোর নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য ও অনন্যতাকে সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত করে দিয়েছে এক শ্রেণির আঁতেল।
তহা আবদুর রহমান এই অনুকরণের ধারা থেকে বেরিয়ে এসেছেন। আরব-ইসলামি ঐতিহ্যের ভেতর থেকেই তিনি নতুন কার্যকরী তত্ত্ব ও ধারণা নির্মাণের কোশেশ করেছেন। মুসলিম আলেম ও চিন্তাবিদরা এই তুরাস গড়ে তুলতে গিয়ে যে যুক্তিপদ্ধতি ও গবেষণা-কৌশল ব্যবহার করেছিলেন, সেগুলো বর্ণনা ও বিশ্লেষণ করাই ছিল তাঁর মূল উদ্দেশ্য।
অনুকরণবাদীর স্বভাব হলো, তাকলিদের দায় এড়াতে বিপরীত পক্ষকেও তাকলিদের তোহমত দেওয়া। কাজেই তহাকে বিভিন্ন বর্গে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে বারবার। আধুনিকতাবাদীরা তাঁকে স্রেফ গাজালিপন্থী বলে সহস্র বছরের পুরোনো বয়ান হিসেবে প্রত্যাখ্যান করতে চেয়েছে। অথচ তিনি নিজেই গাজালির সমালোচনা করেছেন—বিশেষত এরিস্টটলীয় যুক্তিবিদ্যা প্রসঙ্গে। এরিস্টটলীয় যুক্তিশাস্ত্রের প্রতি গাজালির বিশেষ পক্ষপাত ছিল। তিনি একে সার্বজনীন, মানবিক ও বৈশ্বিক যুক্তিপদ্ধতি হিসেবে গণ্য করেছিলেন—মনে করতেন, এরিস্টটল যুক্তিবিদ্যার যে অমোঘ নিয়মাবলি প্রণয়ন করেছেন তা সমগ্র মানবীয় বুদ্ধিবৃত্তির ওপর সমভাবে প্রযোজ্য। তহা এই বক্তব্যের ওপর কঠোর সমালোচনা করেছেন। গাজালি যখন নৈতিক গুণাবলির প্রধান অনুষঙ্গ হিসেবে সাহসিকতা, প্রজ্ঞা, দানশীলতা ও ন্যায়পরায়ণতার কথা বলেছেন—ইবনে তাইমিয়াও মিনহাজুস সুন্নাহতে যা লিখেছেন—তহা দেখিয়েছেন এসব আসলে এরিস্টটলেরই তাকলিদ। ইসলামে নৈতিক গুণাবলির প্রধান অনুষঙ্গ (أمهات الفضائل) হিসেবে তিনি চিহ্নিত করেছেন ঈমান, তাকওয়া, আমানত ও সত্যবাদিতাকে।
দুই
আধুনিকতা প্রসঙ্গে তহার অবস্থান স্বতন্ত্র। তাঁর মতে, আধুনিকতার রূপ ও সুরত একটিমাত্র নয়—বরং বহুবিধ। আধুনিকতা ফরাসি বিপ্লব-পরবর্তী কালখণ্ডের কোনো আকস্মিক আবিষ্কার নয়। সভ্যতার ঊষালগ্নে যখনই কোনো জাতির বিকাশ ঘটেছে, তখনই সমান্তরালে তার আধুনিকতারও সূত্রপাত হয়েছে। মানবজাতির সূচনাকাল থেকে প্রতিটি সংস্কৃতির ও প্রতিটি জনগোষ্ঠীর একটি নিজস্ব ও স্বতন্ত্র আধুনিকতার ইতিহাস রয়েছে। কিন্তু ইউরোপীয় আধুনিকতা জগতের তাবৎ আধুনিক-প্রবণতাকে হয় ইতিহাস থেকে গায়েব করেছে, নয়তো অস্বীকার করেছে। তহার সুস্পষ্ট অবস্থান হলো—আমাদের এই আধুনিকতাকে নবায়ন (তাজদীদ) করতে হবে; একে ফেরাতে হবে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং খোলাফায়ে রাশেদার আধুনিকতার দোরগোড়ায়।
ভাবনাচিন্তার ক্ষেত্রে তহা দুটি সমালোচনামূলক মূলনীতি সামনে রেখেছেন। এ ক্ষেত্রেও তিনি অনুপ্রেরণা নিয়েছেন তুরাসের ইমামদের কাছ থেকে—বিশেষত ইমাম শাফেঈ রাহিমাহুল্লাহর কাছ থেকে। নিজের মত ও অন্য ফকিহের মতের ব্যাপারে একজন মুজতাহিদের দৃষ্টিভঙ্গি কেমন হওয়া উচিত—সে প্রসঙ্গে ইমামের প্রসিদ্ধ বক্তব্য হলো:
رأينا صواب يحتمل الخطأ ورأي غيرنا خطأ يحتمل الصواب— আমাদের বক্তব্য সঠিক, তবে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা আছে; আর অন্যদের মত ভুল, তবে সঠিক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তহা এই ফিকহি প্রজ্ঞা থেকে দুটি নতুন সমালোচনামূলক নীতি নির্মাণ করেছেন—যেগুলো আজনবি সভ্যতা, সংস্কৃতি ও দর্শনকে বিচারের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে চান তিনি।
প্রথম নীতি: كل أمرٍ منقولٍ معترضٌ عليه، حتى تثبت بالدليل صحته — প্রতিটি আমদানিকৃত বিষয়ই আপত্তিসাপেক্ষ ও প্রশ্নবিদ্ধ, যতক্ষণ না অকাট্য প্রমাণের সাহায্যে তার সত্যতা ও বৈধতা প্রতিষ্ঠিত হয়।
দ্বিতীয় নীতি: كل أمرٍ مأصولٍ مسلَّمٌ به، حتى يثبت بالدليل فساده — প্রতিটি ঐতিহ্যগ্রথিত বিষয়ই স্বতঃসিদ্ধ ও গৃহীত, যতক্ষণ না প্রমাণের সাহায্যে তার অসারতা বা ত্রুটি প্রমাণিত হয়।[1]অনেকে কোরআন-হাদিসের টেক্সট-নির্ভর জ্ঞান বোঝাতে ‘মানকুল’ শব্দ ব্যবহার … Continue reading
তিন
শিক্ষা ক্রমশ যন্ত্রগত যুক্তিবাদ (Instrumental Rationality) এবং প্রযুক্তিকেন্দ্রিক প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার মধ্যে সীমিত হয়ে পড়ছে।[2]Digital Transformation in Islamic Education Management in the Era of Society 5.0. (2026). Jurnal At-Tarbiyat: Jurnal Pendidikan Islam, 9(1), 167–180. শিক্ষার দীনি, আখলাকি ও রুহানি মাত্রা নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। ফলে মুসলিম হিসেবে আমাদের আদর্শ এবং আধুনিক শিক্ষাদর্শনের আদলে আমদানিকৃত ফালসাফার মাঝে গভীর দ্বন্দ্ব দানা বেঁধেছে। বাংলাদেশের মতো দরিদ্রপীড়িত দেশেও শিক্ষাকে স্রেফ প্রযুক্তিগত দক্ষতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তহা আবদুর রহমান এই বিমূর্ত যুক্তিবাদ (العقلانية المجردة) ও সেক্যুলার শিক্ষার সমালোচনায় একটি সুসংহত নৈতিক-আধ্যাত্মিক কাঠামো (الائتمانية বা ইতিমানিয়া) উপস্থাপন করেছেন। একই সঙ্গে তিনি এমন একটি সমন্বিত শিক্ষাপ্যারাডাইম প্রস্তাব করেছেন, যা ইলম, আখলাক ও আধ্যাত্মিকতাকে একটি অবিচ্ছেদ্য ঐক্যের মধ্যে গেঁথে রাখে।
হাবেরমাস (১৯৮৭) বিমূর্ত যুক্তিবাদের সমালোচনা করে দেখিয়েছেন, এটি শিক্ষাসহ অন্যান্য সামাজিক চর্চাকে কেবল যান্ত্রিক কর্মকাণ্ডে পরিণত করে। অনুরূপভাবে বিইস্তা (২০০৮) শিক্ষার ‘লার্নিফিকেশন’ প্রক্রিয়ার সমালোচনা করেছেন—যেখানে শিক্ষা মানুষ গঠনের মহৎ উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হয়ে কেবল পরিমাপযোগ্য ফলাফলের মধ্যে বন্দী হয়ে পড়ে। তহার মতে, শিখন প্রক্রিয়া কেবল জ্ঞান অর্জনেই থেমে থাকবে না, বরং তা শিক্ষার্থীকে নৈতিকভাবে দায়িত্ববান মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবে। জ্ঞান যখন আখলাক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তখন সে তার সারার্থ হারিয়ে ফেলে।
এদিকে যখন সেক্যুলার নৈতিকতার প্রস্তাবনা হাজির করা হচ্ছে, তখন তহা বলছেন—মাখলুকের সঙ্গে খালেকের সম্পর্ককে যদি বাদ দেওয়া হয়, তবে এই নৈতিকতা তার মূল রুহানি চেতনা হারিয়ে ফেলে। তাঁর চিন্তাকাঠামোতে আখলাক কেবল সামাজিক নিয়মকানুনের বাহ্যিক প্রকাশ নয়, বরং এটি আল্লাহর প্রতি মানুষের আখলাকি ও রুহানি দায়বদ্ধতার জীবন্ত রূপ। এই দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁকে সেক্যুলার বা লিবারেল এথিক্স থেকে আলাদা করে দেয়। ইতিমানিয়া ধারণার প্রাসঙ্গিকতা এখানেই, এটি নৈতিকতাকে যান্ত্রিক বা প্রাতিষ্ঠানিক প্রজেক্টে পরিণত করার প্রবণতাকে প্রত্যাখ্যান করে এবং মাখলুক, ইলম ও খালেকের মধ্যকার আখলাকি সম্পর্ককে পুনরুজ্জীবিত করে।
সৈয়দ মুহাম্মদ নকীব আল-আত্তাসের ‘আদব হারিয়ে যাওয়া’র সমালোচনার সঙ্গে তহা একমত। তবে আখলাক ও রুহানিয়াতের ভিত্তিতে একটি বিকল্প যৌক্তিকতার (العقل المؤيد) রূপরেখা দিয়ে তিনি আরও একধাপ এগিয়ে গেছেন। ফলস্বরূপ, তহার দর্শনে অনুপ্রাণিত ইসলামি শিক্ষার মূল কাজ কেবল সিলেবাসে ধর্মীয় ও আধুনিক বিষয়ের মিশ্রণ ঘটানো নয়—বরং জ্ঞানের মূল চিন্তাকাঠামো বা প্যারাডাইমটিকেই আমূল বদলে দেওয়া।
শিক্ষার ধর্মনিরপেক্ষকরণের বিরুদ্ধে তাঁর এই অবস্থান জ্ঞান, ধর্ম ও নীতিবিদ্যার আন্তর্জাতিক বিতর্ককে সমৃদ্ধ করে। সাইয়্যেদ হোসেইন নাসর ও ওয়ায়েল হাল্লাকের মতো তিনিও বিজ্ঞান ও ধর্মের বিভাজনকে একটি ত্রুটিপূর্ণ জ্ঞানতাত্ত্বিক কাঠামো হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেন। তবে কেবল সিলেবাসে বিজ্ঞানের ইসলামিকীকরণের সাধারণ প্রচেষ্টার চেয়ে তহার পদ্ধতি অনেক বেশি গভীর ও বৈপ্লবিক, কারণ তিনি শিক্ষার যৌক্তিকতার ভিত্তিটাকেই পুনর্গঠন করতে চান। এভাবে তাঁর চিন্তা কেবল ইসলামি শিক্ষার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না থেকে উচ্চশিক্ষা ও জ্ঞানের নৈতিকতা নিয়ে চলমান বৈশ্বিক আলোচনার সমকক্ষ হয়ে উঠেছে।
চার
১৯৭১ সালে স্বাধীনতা লাভের পর থেকে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক রূপান্তরের ধারাবাহিকতায় একটি ক্রমবর্ধমান বুদ্ধিবৃত্তিক ডিসকোর্স লক্ষ করা যাচ্ছে। এই বয়ানের নেতৃত্ব দিচ্ছে এমন একদল সেক্যুলার ও লিবারেল এলিট শ্রেণি, যারা এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের চেতনায় মিশে থাকা ইসলামি মূল্যবোধের মানচিত্রকে পুনর্গঠন করতে চায়। বর্তমানে প্রায় ১৭ কোটি জনসংখ্যার এই দেশে যার ৯০ শতাংশই মুসলিম, তাদের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যের স্থলে পশ্চিমা লিবারেল নৈতিকতার একচেটিয়া আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে।
এই ডিসকোর্স মূলত তিনটি আন্তঃসংযুক্ত ধারায় দৃশ্যমান। প্রথমত, আধুনিকায়ন ও প্রগতির অপরিহার্য শর্ত হিসেবে জীবন ও রাজনীতি থেকে ধর্মের সম্পূর্ণ বিচ্ছেদ সাধন। দ্বিতীয়ত, ইসলামি নৈতিক কাঠামোর বাইরে গিয়ে সম্পূর্ণ ব্যক্তিকেন্দ্রিক স্বাধীনতার পুনঃসংজ্ঞা প্রদান। তৃতীয়ত, মানবাধিকারের আন্তর্জাতিক সনদগুলোকে একটি নিরপেক্ষ ও বিশ্বজনীন মূল্যবোধের মানদণ্ড হিসেবে উপস্থাপন।
এই বয়ান যখন নিজেকে অত্যন্ত নিরপেক্ষ, যুক্তিসংগত ও বৈশ্বিক হিসেবে উপস্থাপন করছে, ঠিক তখনই একটি মৌলিক দার্শনিক প্রশ্ন হাজির হয়—মূল্যবোধ কি আসলেই কখনো নিরপেক্ষ হতে পারে? নৈতিকতাকে তার নিজস্ব সভ্যতার পরিচয় থেকে বিচ্ছিন্ন করে তার মূল সত্তা টিকিয়ে রাখা কি সম্ভব?
এই জিজ্ঞাসার উত্তর খুঁজতে আমরা সাহায্য নিতে পারি তহা আবদুর রহমানের দর্শনের; বিশেষত তাঁর তাতাদদুদিয়্যাতুল কিয়াম: মা মাদাহা ওয়া মা হুদুদুহা? (মূল্যবোধের বহুত্ববাদ: পরিধি ও সীমাবদ্ধতা) গ্রন্থের। বাংলাদেশের লিবারেল ডিসকোর্সের জ্ঞানতাত্ত্বিক ভিত্তিকে প্রশ্ন করবার জন্য তাঁর দর্শন অত্যন্ত নিখুঁত ও মৌলিক একটি হাতিয়ার। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ইতেমানি (Trusteeship Model) চিন্তাপদ্ধতি আমাদের বুদ্ধিমত্তা, ওহি ও সভ্যতার পরিচয়ের মধ্যে এমন এক বিকল্প সম্পর্কের পথ দেখায়, যা পশ্চিমা লিবারেলিজমের পাবলিক-প্রাইভেট বা রাজনীতি-নৈতিকতার সংকীর্ণ বিভাজনকে পুরোপুরি নাকচ করে দেয়।
বাংলাদেশের লিবারেল ডিসকোর্সের রয়েছে গভীর কাঠামোগত স্ববিরোধিতা। একদিকে এই বয়ান মূল্যবোধের বহুত্ববাদ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কথা বলে; কিন্তু অন্যদিকে একটি নির্দিষ্ট পশ্চিমা মূল্যবোধকে ইসলামি ঐতিহ্যের একমাত্র বিকল্প হিসেবে জোরপূর্বক চাপিয়ে দিতে চায়। এই জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়ার মানসিকতাটিই তাদের নিজেদের দাবি করা ‘বহুত্ববাদ’-এর পরিপন্থী। তহা আবদুর রহমান ইসলামি দার্শনিক ঐতিহ্যের ভেতর থেকে লিবারেল বহুত্ববাদের এই কাঠামোগত ব্যবচ্ছেদ করেছেন।
বাংলাদেশের লিবারেল ডিসকোর্স তার গভীরতম স্তরে প্রতিষ্ঠিত দুটি কৃত্রিম দ্বন্দ্বের ওপর; বুদ্ধি ও ধর্মের সংঘাত এবং রাজনীতি ও নৈতিকতার বিচ্ছেদ। তহার দর্শন এই দুটি নীতিকেই ভেতর থেকে ভেঙে দেয়। তাঁর ইতেমানি মডেল এমন একটি বিকল্প নৈতিক-সভ্যতার নকশা তৈরি করে, যা লিবারেলিজমের কৃত্রিম বাইনারিতে আটকে পড়ে না। এটি এদেশের সেক্যুলার এলিটদের বুদ্ধিবৃত্তিক চ্যালেঞ্জের আরও পরিপক্ব ও গভীর জবাব দিতে সক্ষম। বাংলাদেশের ইসলামি প্রেক্ষাপটে লিবারেল মূল্যবোধের এই অন্ধ-আমদানি মূলত এক ধরনের ‘মূল্যবোধগত একনায়কত্ব’ (Axiological Domination), যা বাংলাদেশের মুসলমানদের ওহিনির্দেশিত নিজস্ব নৈতিক জীবনের অধিকারকে হরণ করে।
ইতেমানি মডেলটি তহার সমগ্র দর্শনের চূড়ামণি। এটি মূলত পশ্চিমা লিবারেল ও সেক্যুলার বস্তুবাদী আধুনিকতার বিপরীতে ইসলামি সভ্যতার একটি পূর্ণাঙ্গ বিকল্প নৈতিক রূপরেখা। এই দর্শনের মূল কথা হলো, মানুষ তার নিজের, তার বুদ্ধি ও মূল্যবোধের স্বাধীন বা একচ্ছত্র মালিক (Owner) নয়; বরং সে এই বিশ্বচরাচরে আল্লাহর দেওয়া পবিত্র আমানতের ‘রক্ষক’ (Trustee)। এই মডেল লিবারেলিজমের তৈরি করা ব্যক্তি বনাম সমাজ, ধর্ম বনাম রাজনীতি এবং নৈতিকতা বনাম নাগরিক জীবনের কৃত্রিম দেয়াল ভেঙে ফেলে এক সুসংহত ঐক্য তৈরি করে।
তহা বলেন, আমাদের কাম্য বহুত্ববাদ এমন হবে যেখানে বুদ্ধিবৃত্তিক নৈরাজ্য থাকবে না, কোনো রাজনৈতিক আধিপত্য থাকবে না, কোনো সাংস্কৃতিক চরমপন্থা থাকবে না। তাঁর মতে, বুদ্ধিবৃত্তিকে বিশ্বাসের মূলনীতির (مبدأ الإيمان) সঙ্গে জুড়ে দিতে হবে; কেননা নিয়ন্ত্রণহীন কোনো বুদ্ধিবৃত্তির অস্তিত্ব থাকতে পারে না। রাজনীতিকে কল্যাণের মূলনীতির (مبدأ الخير) সঙ্গে যুক্ত করতে হবে; কারণ লাগামহীন কোনো রাজনীতি চলতে পারে না। এবং সংস্কৃতিকে মানুষের সহজাত স্বভাব ফিতরাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত রাখতে হবে; কেননা নিয়ন্ত্রণহীন কোনো সংস্কৃতিও হতে পারে না।[3] طه، عبد الرحمن. (2014). تعددية القيم: ما مداها وما حدودها؟ الدار البيضاء: المركز الثقافي العربي، ص. 51
এই বক্তব্য লিবারেল বহুত্ববাদের সঙ্গে তহার বহুত্ববাদের গুণগত পার্থক্য স্পষ্ট করে দেয়। তিনি দেখিয়েছেন, পশ্চিমা লিবারেল বহুত্ববাদের ভেতরে তিনটি বড় রোগ লুকিয়ে আছে। এক: التسيب العقلي — বুদ্ধিবৃত্তিক নৈরাজ্য, যা ওহিকে বাদ দিয়ে কেবল বুদ্ধিকে একক মানদণ্ড বানানোর ফলে জন্ম নেয়। দুই: التسلط السياسي — রাজনৈতিক আধিপত্য, যা নৈতিকতার ওপর রাজনীতিকে প্রাধান্য দেওয়ার ফলে তৈরি হয়। তিন: التطرف الثقافي — সাংস্কৃতিক চরমপন্থা, যা ফিতরাতকে অস্বীকার করে সমাজ-সংস্কৃতির বিকৃতিকে ‘অধিকার’ বলে স্বীকৃতি দেয়।
পাঁচ
আখলাক তহার দর্শনের একটি মৌলিক প্রস্তাবনা। এ বিষয়ে তাঁর কয়েকটি মূল দাবি উপস্থাপন করা যায়।
০১. তহার মতে, নৈতিকতা মানুষের জীবনের এমন এক অপরিহার্য গুণ, যার বিলুপ্তিতে মানবজীবনের স্বাভাবিক শৃঙ্খলা ও ভারসাম্য ভেঙে পড়ে। এটি স্রেফ কোনো আপতিক (عرضية) বা বিলাসিতাপূর্ণ (كمالية) বিষয় নয় যার বর্জনে কেবল বাহ্যিক ভদ্রতা ক্ষুণ্ণ হবে; বরং এটি জীবন টিকিয়ে রাখার মূল চালিকাশক্তি।
০২. অন্য যেকোনো মূল্যবোধের চেয়ে নৈতিক মূল্যবোধের স্থান সবার আগে। মানুষ স্বীয় জীবনে যা কিছু কর্ম সম্পাদন করে, তা অবধারিতভাবে সবার আগে নৈতিক মূল্যায়নের কষ্টিপাথরেই যাচাই হয়।
০৩. মানুষের প্রকৃত মানবীয় সত্তা বা সারবত্তা (Essence) নির্ধারিত হয় তার নৈতিকতার দ্বারা, বুদ্ধিবৃত্তি বা যুক্তির (عقل) দ্বারা নয়। এখানে যুক্তি মূলত নৈতিকতার অধীনস্থ ও অনুগামী। তাই যুক্তি যখন কল্যাণের পথ দেখায় তখন তা প্রশংসনীয় (محمود) হয়, আর যখন অপকার করে তখন তা নিন্দনীয় (مذموم) গণ্য হয়; এর বিপরীতটি কখনো সত্য নয়।
০৪. নৈতিকতার অমোঘ উৎস হলো আল্লাহর কালাম বা অবতীর্ণ দ্বীন (الدين المنزل)। ফলে কেউ যখন ‘সেক্যুলার নৈতিকতা’ (Secular Ethics) শব্দযুগল ব্যবহার করে, তখন তা জ্ঞানতাত্ত্বিক দিক থেকে একটি সম্পূর্ণ স্ববিরোধী ও অর্থহীন উক্তিতে পরিণত হয়।
০৫. মানুষ তার সহজাত নৈতিক কাঠামোর (ফিতরাত) কারণেই নিজেকে আধ্যাত্মিকতার অনুভূতি থেকে সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন করতে পারে না; তা সে যতই চেষ্টা করুক। কেউ যদি সচেতনভাবে ও স্বেচ্ছায় ধর্মকে প্রত্যাখ্যানও করে, তবুও সে অবচেতনভাবে ধর্মের কোনো না কোনো রূপের ভেতর নিপতিত হয়।
০৬. নৈতিকতা কোনো একক বা জড় স্তরে স্থবির বিষয় নয়, বরং এর বিভিন্ন স্তর বা পর্যায় (مراتب) রয়েছে। ফলে একই ব্যক্তি জীবনের ভিন্ন ভিন্ন বাঁকে নৈতিকতার নানাবিধ স্তরে আবর্তিত হতে পারে।
০৭. মানুষের নৈতিক সংকল্প বা স্পৃহা (الهمة الأخلاقية) যেকোনো বিদ্যমান রূঢ় বাস্তবতার চেয়েও শক্তিশালী এবং ইতিহাসের তথাকথিত ‘অনিবার্যতা’র চেয়েও সুদৃঢ়। চোখ রাঙানো বর্তমান পরিস্থিতি মানুষের অসীম সম্ভাবনাকে নিঃশেষ করতে পারে না, আর ইতিহাসের কোনো অবধারিত পরিণতিও মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তিকে স্তব্ধ করতে পারে না।
০৮. ধর্মীয় ও আত্মিক অনুশাসন থেকে বিচ্ছিন্ন ‘বিমূর্ত বুদ্ধিবৃত্তি’ (العقل المجرد)-র কর্মফল অচিরেই তার মূল উদ্দেশ্যের বিপরীত রূপ ধারণ করে। যে বৈজ্ঞানিক বা তাত্ত্বিক উদ্ভাবন থেকে মানবজাতির কল্যাণের আশা করা হয়েছিল, তা উল্টো মানুষের জন্য চরম বিপর্যয় ও ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
ছয়
বাংলায় তহা আবদুর রহমানকে হাজির করার পেছনে একটি সুনির্দিষ্ট কারণ আছে।
বাংলাদেশের চিন্তা ও সংস্কৃতি এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। রাষ্ট্র পরিবর্তনকামী, সমাজকাঠামোতে নতুন রূপ ও মাত্রা দৃশ্যমান হচ্ছে। এই বাস্তবতায় তহার চিন্তা নানাভাবে প্রাসঙ্গিক। সেই প্রাসঙ্গিকতার বিভিন্ন দিক এই সংখ্যার লেখাগুলোতে উঠে এসেছে। তবে এটি তহাবন্দনার আয়োজন নয়; তাই তাঁর চিন্তার সমালোচনাও এখানে জায়গা পেয়েছে।
এই সংখ্যার সূচনাটা হয়েছিল বাইতুল মোকাররমে। নামাজের পর বসে আহমাদ সাব্বির ভাইকে প্রস্তাব দিলাম, তহা আবদুর রহমানের চিন্তাদর্শনের ওপর একটি বিশেষ সংখ্যা করা যায় কি না। তিনি তাৎক্ষণিক রাজি হয়ে গেলেন। এরপর আমার অলসতা আর কর্মজীবনের নানা ব্যস্ততায় কাজটি শেষ করতে কয়েক মাস পেরিয়ে গেল। অবশেষে আলোর মুখ দেখছে, এজন্য আমি যারপরনাই আনন্দিত।
বিশেষ ধন্যবাদ আহমাদ সাব্বির ভাইকে। বারবার তাগিদ না দিলে কাজটি হয়তো আরও পিছিয়ে যেত। কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি সকল লেখককেও; যাঁদের অনেককে মেসেজ ও ফোনে বারবার বিরক্ত করতে হয়েছে।
আল্লাহ আমাদের এই উদ্যোগকে কামিয়াবি দান করুন।
তথ্যসূত্র:
| ↑1 | অনেকে কোরআন-হাদিসের টেক্সট-নির্ভর জ্ঞান বোঝাতে ‘মানকুল’ শব্দ ব্যবহার করেন, আর বুদ্ধিজাত জ্ঞানকে বলেন ‘মা’কুলাত’। কাজেই তহা ‘মানকুল’ এবং ‘মা’সুল’—এই দুটি প্রধান শব্দবন্ধের ব্যাপারে একটি ব্যাখ্যা দেওয়া জরুরি মনে করেছেন। তিনি বলেন, ইসলামি পরিমণ্ডলের বাইরে—বিশেষত পশ্চিমা জ্ঞানতাত্ত্বিক পরিমণ্ডল থেকে—আমরা যা কিছু গ্রহণ বা নকল করি, তা বোঝাতে ‘মানকুল’ প্রত্যয়টি ব্যবহার করা হচ্ছে। এটি ‘মা’সুল’ শব্দটির বিপরীত—যা দ্বারা ইসলামি চিন্তার পরিমণ্ডল থেকে গৃহীত উপাদানগুলো নির্দেশিত হয়। ‘মা’সুল’ শব্দটিকে ‘আসিল’ (الأصيل)-এর পরিবর্তে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে দুটি কারণে—একদিকে ‘আসিল’ শব্দটির অতি-ব্যবহারজনিত ক্লিশে ভাব এড়ানো, আর অন্যদিকে ‘মা’সুল’ ও ‘মানকুল’ উভয় শব্দের আরবি ‘মাফ’ঊল’ (مفعول) ছন্দের অভিন্নতা বজায় রাখা। তদুপরি, ‘মানকুল’ পরিভাষাটি অর্থের দিক থেকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ—এটি কোনো মানসিক পক্ষপাত তৈরি করে না, যা বহুল প্রচলিত ‘মুস্তাওরাদ’ (আমদানিকৃত) ও ‘ওয়াফিদ’ (আগত) শব্দ দুটির ক্ষেত্রে ঘটে। প্রথমটি নেতিবাচক ব্যঞ্জনা বহন করে, দ্বিতীয়টি ইতিবাচক। ‘মানকুল’ এই দুটি চাপ থেকে মুক্ত—সম্পূর্ণ বস্তুনিষ্ঠ। |
|---|---|
| ↑2 | Digital Transformation in Islamic Education Management in the Era of Society 5.0. (2026). Jurnal At-Tarbiyat: Jurnal Pendidikan Islam, 9(1), 167–180. |
| ↑3 | طه، عبد الرحمن. (2014). تعددية القيم: ما مداها وما حدودها؟ الدار البيضاء: المركز الثقافي العربي، ص. 51 |