ওয়াইল বি. হাল্লাক কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মানববিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এবং সমকালীন ইসলামী আইন, নৈতিকতা ও আধুনিকতা-সমালোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চিন্তক। তাঁর গবেষণার কেন্দ্রে রয়েছে আধুনিকতার আবির্ভাবে সৃষ্ট জ্ঞানতাত্ত্বিক বিচ্ছেদ, ওরিয়েন্টালিজমের বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাস এবং ইসলামী আইন ও নৈতিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিক বিকাশ। হাল্লাক প্রাক-আধুনিক ইসলামী আইনের কাঠামোগত গতিশীলতা বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে নৈতিক তত্ত্ব ইসলামী আইন ও রাজনীতির কেন্দ্রে অবস্থান করে। গত দেড় দশকে তিনি আধুনিক রাষ্ট্র, আইন ও জ্ঞান-উৎপাদনের আদর্শ কাঠামোর গভীর সমালোচনা করেছেন। অষ্টম থেকে অষ্টাদশ শতাব্দীর ইসলামী শাসনব্যবস্থার সাংবিধানিক চর্চা বিশ্লেষণের মাধ্যমে তিনি আধুনিক সাংবিধানিকতার বিকল্প চিন্তাকাঠামো নির্মাণের চেষ্টা করছেন। তাঁর গ্রন্থসমূহ বিশ্বজুড়ে ব্যাপকভাবে আলোচিত, অনূদিত ও পুরস্কৃত, যা তাঁকে বৈশ্বিক মানববিদ্যার এক প্রভাবশালী কণ্ঠে পরিণত করেছে।
Jadaliyya (J): কোন বিষয়টি আপনাকে এই বইটি লিখতে উদ্বুদ্ধ করেছে?
Wael Hallaq (WH): যখন আমি আমার বই “Shari‘a : Theory, Practice, Transformations” (২০০৯ সালে কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত) শেষ করছিলাম, তখন আমি বুঝতে পারলাম যে, বইটিতে দুইশ পৃষ্ঠাজুড়ে আধুনিক যুগের আলোচনা করা হলেও রাষ্ট্রের আলোচনায় একটি ঘাটতি রয়ে গেছে। আমি আরও বুঝেছিলাম, আমরা পণ্ডিতরা আমাদের জীবন এবং বিশ্ব-দৃষ্টিভঙ্গি গঠনে রাষ্ট্রের ভূমিকার প্রতি যথাযথ মনোযোগ দিইনি। আমরা রাষ্ট্রকে হালকাভাবে নিয়েছি, যেন এটি ছিল প্রায় একটি স্বাভাবিক ঘটনা। আমার দৃঢ় বিশ্বাস হলো, শরীয়ত এবং আধুনিক রাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্ক ব্যাখ্যা করার জন্য একটি সম্পূর্ণ বইয়ের প্রয়োজন, শুধুমাত্র শরিয়া কী করেছিল তার পরিপ্রেক্ষিতে নয়, বরং উভয়ের মধ্যে সাধারণ কাঠামোগত সম্পর্ক পরীক্ষা করার জন্যও। আমি ভেবেছিলাম শাসনপদ্ধতি হিসেবে দুটি ব্যবস্থা কীভাবে কাজ করে তা বোঝা গুরুত্বপূর্ণ।
তাই এ ধরণের একটি বই লেখার সিদ্ধান্তের পেছনে আমার প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল কেন আধুনিক রাষ্ট্রের হাতে শরিয়া পুনর্গঠিত—প্রকৃতপক্ষে বিকৃত—হয়েছিল তা স্পষ্ট করে বলা। আমার দীর্ঘ বই শরিয়ার তৃতীয় অংশে আমি “কীভাবে এটি পুনর্গঠিত হয়েছিল” প্রশ্নের উত্তর দিয়েছি। তাই আমি ভেবেছিলাম—এটি আরও প্রাসঙ্গিক এবং আরও বেশি আকর্ষণীয় ও পাণ্ডিত্যপূর্ণ প্রকল্প হবে যদি আমি আমার অনুসন্ধানকে কেবল তুলনা নয়, বরং সামঞ্জস্যের বিচারে গঠন করি। যেহেতু আমি ইতিমধ্যেই খুব ভালো করে জানতাম যে দুটি ব্যবস্থা সম্পূর্ণরূপে অসঙ্গত, তাই বাকি কাজটি ছিল আমার চূড়ান্ত প্রশ্নটি তৈরি করা: একটি ইসলামী রাষ্ট্র কি সম্ভব? আমার কাছে মনে হয়েছিল, এই ধরণের অ্যাপ্রোচ মানুষের উদ্বেগের প্রতি আরও সরাসরি আবেদন করবে। আজকের আরব বিশ্বের (২০১৩ সালের) ঘটনাবলীর আলোকে, বইটির চেয়ে সময়োপযোগী আর কিছু হতে পারত না।
Jadaliyya (J): বইটির মূল বিষয়বস্তু সম্পর্কে কি আপনি আমাদের একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিতে পারবেন?
Wael Hallaq (WH): পুরো বই জুড়ে আমার ভাষা এবং পরিভাষার অর্থ কী তা স্পষ্ট করার জন্য আমি দুটি ভূমিকামূলক অধ্যায় (অধ্যায় ১ ও ২) লিখেছি। এগুলো শুধু স্কলারলি লেখার নিয়ম হিসেবে লেখা হয়নি, বরং আমার বইয়ের যুক্তির ভিত্তি ছিল। আমি প্রগতি (Progress) মতবাদ, স্মৃতিকাতরতা (Nostalgia) এবং—খুব গুরুত্বপূর্ণ—পাটাতন (Paradigm) তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করেছি। এখনো পর্যন্ত, কোনো কোনো পাঠক এই দুটি অধ্যায় এবং বইয়ের বাকি অংশের মধ্যে সম্বন্ধ অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছেন। সঠিকভাবে বোঝার জন্য, এই প্রাথমিক অধ্যায়গুলো আরও গভীরভাবে পড়া উচিত যাতে বইয়ের বাকি অংশের উপাদানের প্রেক্ষাপটে মূল ধারণাগুলো যথাযথভাবে বোঝা যায়।
তৃতীয় অধ্যায়ে এক হাজার বছরের চর্চায় (ইউরোপীয় উপনিবেশায়নের আগ পর্যন্ত) থাকা ইসলামের সাংবিধানিক কাঠামোর সাথে বর্তমান ইউরো-আমেরিকার তুলনা করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে, পূর্ববর্তী ব্যবস্থাটি পরবর্তীকালের তুলনায় আরও বেশি শক্তিশালী (robust)। এই সিদ্ধান্তে পৌঁছুনো কোনো কঠিন কিছু ছিল না, যদিও এর অসাধারণ তাৎপর্য রয়েছে যা নিঃসন্দেহে সুদূরপ্রসারী (এবং, আমি জোর দিতে চাই, বর্তমান আরব বসন্তের মধ্যে যেকোনো চিন্তাভাবনার জন্য এটা প্রাসঙ্গিক)।
চতুর্থ অধ্যায়ে যুক্তি দেওয়া হয়েছে যে, একদিকে, আমি যাকে বলেছি ইসলামী শাসনব্যবস্থা এবং শরিয়া আর অন্যদিকে আধুনিক রাষ্ট্রের আইনি, রাজনৈতিক এবং নৈতিক ধারণার মধ্যে গভীর পার্থক্য রয়েছে। অন্য কথায়, তারা দুটি ভিন্ন ধারণা এবং বিশ্ব-দৃষ্টির প্রতিনিধিত্ব করে। পঞ্চম অধ্যায়টি আমার সামগ্রিক থিসিসের কেন্দ্রবিন্দু। এখানে যুক্তি দেওয়া হয়েছে যে, ইসলামী শাসনব্যবস্থা এবং আধুনিক রাষ্ট্র—দুটি ভিন্ন ধরণের মানুষ যদি না-ও হয়, তবে দুটি ভিন্ন ধরণের ব্যক্তিত্ব তৈরি করে। পরবর্তী অধ্যায়ে প্রকৃত ইসলামী শাসনব্যবস্থার যেকোনো রূপের জন্য পুঁজিবাদী এবং কর্পোরেট চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। শেষ অধ্যায়ে, আমি নৈতিক দর্শন থেকে নেওয়া সমাপ্তিমূলক মন্তব্যগুলো প্রদান করি এবং আধুনিকতার প্রভাবশালী কিন্তু অত্যন্ত ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে মুসলিম এবং অমুসলিম পণ্ডিত এবং নেতৃবৃন্দের (প্রধানত পশ্চিমা) পদক্ষেপগুলোকে একীভূত করার জন্য তাদের মাঝে একটি বিশেষ সংলাপ তৈরির প্রয়োজনীয়তার উপর গুরুত্ব প্রদান করি।
Jadaliyya (J): এই বইটি কোন ক্ষেত্র বা একাডেমিক বিশেষজ্ঞতার মধ্যে পড়ে?
Wael Hallaq (WH): মনে হয় কোনো কোনো সমালোচক বইটির শুরুর বাক্যটিকে আক্ষরিক অর্থেই নিয়েছেন—এবং খুব সীমিতভাবে, এটির উপরই মনোযোগ দিয়েছেন এবং এর বাইরে কিছু দেখতে অস্বীকার করেছেন। সেখানে আমি লিখেছিলাম : ‘এই বইয়ের যুক্তি মোটামুটি সরল : আধুনিক রাষ্ট্রের যেকোনো আদর্শ সংজ্ঞার বিচারে “ইসলামী রাষ্ট্র” ধারণা অসম্ভব এবং স্ববিরোধী।’ বইটি অবশ্যই এই বিষয়টিকে খুব গুরুত্ব সহকারে নিয়েছে, এবং প্রশ্নটি যদি কেন্দ্রীয় এবং শীর্ষস্থানীয় ইস্যুর চেয়ে কম কিছু হতো তবে এটি এভাবে লেখা হতো না। কার্যকরভাবে এই প্রশ্নটির মুখোমুখি হওয়ার জন্য, বইটি অন্যান্য আনুষঙ্গিক যুক্তিও তৈরি করেছে। সুতরাং বইটির অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ (ঘোষিত এবং অঘোষিত) উদ্দেশ্য রয়েছে, যা আমাকে বিভিন্ন বিশেষায়িত বিষয় এবং ডিসিপ্লিনে জড়িত হতে বাধ্য করেছিল।
অতএব, আমি তিনটি প্রধান ক্ষেত্র এবং বেশ কয়েকটি উপক্ষেত্রের উপর কাজ করেছি। প্রথমটি হল আইন এবং এর বিভিন্ন উপ-ক্ষেত্র, যার মধ্যে রয়েছে আইন ব্যবস্থা, আইন দর্শন এবং আইন তত্ত্ব অধ্যয়ন থেকে শুরু করে সংবিধান এবং সাংবিধানিকতাবাদ (ঘটনাক্রমে, এই শেষোক্ত বিষয়টি তৃতীয় অধ্যায়ের পুরো অংশজুড়ে ছিল)। দ্বিতীয় ক্ষেত্রটি হলো রাজনীতি, রাজনৈতিক তত্ত্ব এবং রাজনৈতিক দর্শন। বুঝতেই পারছেন, নাগরিক, জাতীয়তাবাদ এবং আধুনিক রাষ্ট্রের কাল্পনিক চরিত্রের মতো ধারণাগুলি আমার মূল উদ্বেগ ছিল। তৃতীয় এবং শেষ প্রধান ক্ষেত্রটি হলো সাধারণভাবে দর্শন এবং বিশেষ করে নৈতিক দর্শন। এখানে আমি নাগরিক এবং জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক ধারণাগুলির বিশ্লেষণকে নৈতিক সত্তায় রূপদানকারী ‘প্রযুক্তি’র সাথে একত্রিত করেছি। বইটিতে আংশিকভাবে নৃতত্ত্ব এবং সমাজতত্ত্বও জড়িয়ে আছে, এ হলো দুটি শাখা, যার প্রতি আমি গত দেড় দশক ধরে আগ্রহী।
Jadaliyya (J): এই বইটি আপনার পূর্ববর্তী গবেষণার সাথে কীভাবে সম্পর্কিত এবং/অথবা তার থেকে আলাদা?
Wael Hallaq (WH): কোনো কোনো পণ্ডিতের পক্ষ থেকে কিছু ভুল বোঝাবুঝি রয়েছে বলে মনে হচ্ছে যে, ২০০৯ সালে আমার বই ‘শরিয়া’ (এবং এর যমজ, ইন্ট্রুডাকশন টু ইসলামিক ল) প্রকাশের সময় আমি আমার গবেষণা এবং পাণ্ডিত্যপূর্ণ কাজের মধ্যে একটি পরিবর্তন এনেছিলাম। সত্য থেকে এর চেয়ে দূরে কোনো কথা হতে পারে না, এবং ইম্পসিবল স্টেইট সম্পর্কেও একই কথা বলা যেতে পারে। এই বইগুলি কেবল আমার আগ্রহের পরিধি প্রসারিত করে, যা স্বীকার করা যায় যে ২০০৫ সাল পর্যন্ত অভিজ্ঞতাগত এবং ভাষাতাত্ত্বিক দিকে পরিচালিত ছিল এবং এখন একটি তাত্ত্বিক মাত্রা অর্জন করেছে যা সম্ভবত আমার বৌদ্ধিক অনুসন্ধানে একটি নতুন প্রয়োজন বা একটি নতুন লক্ষ্য প্রতিফলিত করে।
প্রায় তিন দশক ধরে ইসলামী ঐতিহ্যের ডিসকার্সিভ ক্ষেত্রগুলিতে চাষাবাদ করার পর, আজকের জ্বলন্ত বিষয়গুলির বিষয়ে আমি যা শিখেছি তার ফসল ঘরে তোলার সময় এসেছে। অতএব, “অসম্ভব রাষ্ট্র” আমার পূর্ববর্তী কাজ থেকে সরে আসে না, বরং কেবল এটিকে প্রসারিত করে এবং এটিকে আরও স্পষ্ট তাত্ত্বিক ভিত্তি দেয়। আমি জোর দিয়ে বলতে চাই যে “চিন্তুার মূল বিষয়” প্রায় শুরু থেকেই বিদ্যমান ছিল, তবে বিশেষ কারণে এটিকে বের করে আনা (অথবা যদি বলতে চান, তা প্রকাশ করা) ক্রমশ প্রয়োজনীয় হয়ে উঠছে।
Jadaliyya (J): এই কারণগুলি কী কী?
Wael Hallaq (WH): আমি যেমন বলেছি, বইটি অনুসন্ধানের অন্তত তিনটি ক্ষেত্রকে একত্রিত করে এবং সেগুলি নিয়ে আলোচনা করে : আইন, রাজনীতি এবং দর্শন। অসম্ভব রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য (যা আমি স্পষ্ট করেও বলেছি) ছিল পশ্চিমা একাডেমিকদের টেবিলে ইসলামী বুদ্ধিবৃত্তিক এবং দার্শনিক-নৈতিক এজেন্ডা নিয়ে আসা, অর্থাৎ, পশ্চিমা পণ্ডিতদের এমন একটি বিতর্কে আহ্বান করা যেখানে ইসলামী সংস্কৃতি এবং ইতিহাসের এত সুপ্ত—কিন্তু এত প্রাণবন্ত—বিষয়গুলি অন্তর্ভুক্ত থাকবে, তা রাজনৈতিক, আইনি, বা দার্শনিক হোক না কেন। তবে, কথা এখানেই শেষ নয়। বইটি আধুনিকতা এবং আধুনিক অবস্থা সম্পর্কে আলোচনার দরজা খুলে দেওয়ার একটি প্রচেষ্টাও। যেকোনো বুদ্ধিমান পাঠক এটি বুঝতে পারবেন, যদিও দুর্ভাগ্যবশত—কিন্তু আশ্চর্যজনক নয়—কিছু আইন পণ্ডিত এবং অন্যান্য একাডেমিক এই বিষয়টি মিস করেছেন।
যেহেতু বইটি ইসলামী রাষ্ট্রের অসম্ভবতা সম্পর্কে, তাই এটি স্পষ্টতই আধুনিকতার একটি শক্তিশালী ক্রিটিকও বটে। আর তত্ত্ব ছাড়া, আপনি রাজনৈতিক তত্ত্ব, নৈতিক দর্শন এবং আইনের পশ্চিমা ক্ষেত্রের পণ্ডিতদের নাগাল পাবেন না। এটিই একমাত্র উপায় যা সম্পর্কে আপনি তাদের আগ্রহী করে তুলতে পারেন, যদি আদৌ হয়। আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, এমনকি পশ্চিমা বুদ্ধিজীবীদের (যাদেরকে আমরা বিস্তৃত জ্ঞানের অধিকারী মনে করি) নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্বরাও ইসলাম এবং নৈতিক বা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সম্পর্কে শুধু খুব কমই জানেন না; তারা এর সাথে সম্পর্কিত যেকোনো কিছু থেকে দূরে সরে যান, যেন ইসলাম একটি বুদ্ধিবৃত্তিক রোগ (intellectual disease)। বইটি এই পরিস্থিতি পরিবর্তনের একটি বিনীত প্রচেষ্টা। এটি তাদের চ্যালেঞ্জ করার এবং তাদের সংকীর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক গর্ত থেকে তাদেরকে বের করে আনার একটি প্রচেষ্টা।
পরিশেষে, এবং কম গুরুত্বপূর্ণ নয়, বইটি যে জোরালো বার্তাটি দেওয়ার চেষ্টা করছে তা হলো : সব আলোচনা-পর্যালোচনা শেষে, স্থানীয় ইসলামী শাসনব্যবস্থার রূপগুলি নির্মাণের জন্য পশ্চিমা মডেলের মতোই ইসলামী ঐতিহ্য একটি ভালো উদাহরণ এবং মডেল প্রদান করে, যদি আরও ভালো না হয়। যদিও কেউ ইতিহাস এবং ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠান এবং ধারণাগুলি ফিরিয়ে আনতে পারে না (যদি এটি আদৌ কাম্য হয়), ইতিহাস থেকে কিছু গঠনমূলক মূল্যবোধ পুনরুদ্ধার করা অবশ্যই সম্ভব এবং কাম্য। উদাহরণস্বরূপ, বইয়ের তৃতীয় অধ্যায়ে দেখা গেছে, আইনের শাসনের ঐতিহ্যবাহী ইসলামী মডেল ইউরো-আমেরিকান মডেলের চেয়ে অনেক বেশি বিশ্বাসযোগ্য। পুরো বইটি নৈতিক ও রাজনৈতিক দর্শনের দিকগুলির ক্ষেত্রে একই রকম অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করে।
Jadaliyya (J): তাহলে আপনার উদ্দিষ্ট পাঠক কারা, এবং বইটি কেমন প্রভাব ফেলুক বলে আপনি চান?
Wael Hallaq (WH): আইন, রাজনীতি এবং দর্শনের পণ্ডিতরা প্রধান লক্ষ্য, কিন্তু বইটি এমনভাবে লেখা হয়েছে যাতে এটি মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞানের সকলের কাছে (এবং এমনকি চিন্তাশীল মননের অধিকারী পেশাজীবী, যারা দুর্ভাগ্যবশত খুব বেশি নয়) সহজলভ্য হয়।
আপনার প্রশ্নের দ্বিতীয় অংশের কথা বলতে গেলে, আমি অবশ্যই বলতে চাই যে, আমরা একটি অসাধারণ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পেয়েছি। আমি আবারও বলতে চাই যে, বইটি মূলত আধুনিকতার প্রাথমিক সমালোচনা, এবং আমাদের চিন্তাভাবনার সীমায় ধাক্কা দেয়ার চেষ্টা করে, যা আমরা স্বাভাবিক বলে মনে করি এবং যা আমরা সুপ্ত রেখে দিয়েছি।
মনের অভ্যাসের চেয়ে বিপজ্জনক আর কিছু আছে বলে আমি মনে করি না, অর্থাৎ, যখন কোনো রাষ্ট্রের পরিস্থিতি স্বাভাবিক এবং প্রশ্নাতীত হয়ে ওঠে; কারণ আমরা অন্য কিছু দেখতে পাচ্ছি না বা বিবেচনা করতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছি। আধুনিক অবস্থা অস্থির, এবং আমাদের এখন বিকল্প ও কাঠামোগত সমাধান সম্পর্কে চিন্তাভাবনা শুরু করা উচিত। এই দৃষ্টিভঙ্গির একটি শাখা হলো মুসলিমদের শাসন সম্পর্কে চিন্তাভাবনা শুরু করা—আমি বলতে চাইছি রাজনৈতিক এবং আইনি শাসন—তাদের নিজস্ব, স্বাধীন উপায়ে, কেবল অন্ধভাবে ইউরো-আমেরিকান ব্যবস্থা অনুকরণ করার পরিবর্তে। আমি এখন পুরোপুরি নিশ্চিত যে সেই ব্যবস্থা দেউলিয়া। বইটিতে আমি যেমনটা দেখিয়েছি, ইউরো-আমেরিকার মৌলিক সাংবিধানিক কাঠামো অত্যন্ত সমস্যাযুক্ত এবং যেকোনো সমাজের জন্য অনুপযুক্ত, যে সমাজ সত্যিকার অর্থে সুশাসন অর্জন করতে চায়। এটা কিছুটা বিদ্রূপাত্মক যে, অনেক ইউরো-আমেরিকান চিন্তাবিদ এবং পণ্ডিত তাদের দেশের গুরুতর রাজনৈতিক এবং সাংবিধানিক সমস্যা সম্পর্কে সচেতন থাকলেও, সাধারণভাবে মুসলিম নেতৃত্ব (সেটি উদারপন্থী হোক বা প্রায়শই ইসলামপন্থী) ধরে নিচ্ছেন যে ইউরো-আমেরিকার মধ্যেই একমাত্র কার্যকর মডেল বিদ্যমান। আমি মনে করি, এটি একটি গুরুতর ভুল।
Jadaliyya (J): ইসলামী রাষ্ট্রের সম্ভাবনা এবং আকাঙ্ক্ষা নিয়ে তীব্র বিতর্কের সময় বইটি প্রকাশিত হওয়া কেমন হবে বলে মনে করেন?
Wael Hallaq (WH): বইটি আসলেই খুব সময়োপযোগী ছিল। প্রকৃতপক্ষে, প্রকাশের এক মাসের মধ্যেই এটি নজরে আসে এবং চীনা, জাপানি, বাহাসা ইন্দোনেশিয়ান এবং অবশ্যই আরবি (এবং সম্ভবত ইতালীয়)-সহ বেশ কয়েকটি ভাষায় অনুবাদ শুরু হয়ে যায়। আরবি অনুবাদ সম্পন্ন হয়েছে এবং কয়েক মাসের মধ্যে এটি মুদ্রিত হওয়ার কথা রয়েছে। যাহোক, সময়োপযোগিতা একটি অসুবিধাও হতে পারে। আমরা স্পষ্টতই অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, এবং দ্বন্দ্ব ও তীব্র অনুভূতি তুঙ্গে। আবেগপ্রবণতা এবং রাজনৈতিক ক্ষোভ আমার লেখা বইয়ের মতো বই পড়ার সাথে যায় না।
এর জন্য প্রয়োজন হলো “গভীর পাঠ” যা আমার বইয়ের মজবুত গাঁথুনির জন্য উপযোগী। এটি কোনো রাজনৈতিক ম্যানিফেস্টো নয়, অর্থাৎ সমাধানগুলো রাজনৈতিক নয়। এ বইটি বিকল্প নিয়ে পুনর্ভাবনার আহ্বান। বলতে পারেন, এটি জ্ঞানতাত্ত্বিক পুনর্পাঠ সম্পর্কে।
এটি পাঠককে তার আরামদায়ক অনুমানগুলো ত্যাগ করার চ্যালেঞ্জ জানায় যা অভ্যাসের বিষয় হয়ে উঠেছে (তাই প্রথম দুটি অধ্যায়ের গুরুত্ব এবং বইয়ের বাকি অংশের সাথে তাদের সংযোগ)। অন্য কথায়, বইটি সঠিকভাবে পড়ার জন্য বুদ্ধিবৃত্তিক সাহসের প্রয়োজন। এটি দুর্বল হৃদয়ের লোকদের জন্য নয়, কারণ তারা এটি হজম করতে পারবে না।
[মূল সাক্ষাৎকারটি পড়তে ভিজিট করুন : https://www.jadaliyya.com/Details/29533 ]