আল্লামা শিবলি নোমানির ঐতিহাসিক সফরনামা : তুরস্ক, মিশর ও সিরিয়া সফর (১ম পর্ব)

মূল : আল্লামা শিবলি নোমানি

আরিফ রব্বানী খান

সফরে আগ্রহী হওয়ার কারণ

যেদিন ‘Heroes of Islam’ বইটি লেখার কথা প্রথম মাথায় আসে সেদিনই মনে হয়েছিল আমাদের দেশে এটা লেখার মতো যে উপাদান আছে তা কোনোভাবেই যথেষ্ট না—মিশর ও তুরস্কে যে পরিমাণ ইসলামি রচনা সম্ভার অবশিষ্ট আছে সেগুলোর সহায়তায় এ ধরনের সংকলন প্রস্তুত করা অবশ্যই সম্ভব হবে।

এই পরিকল্পনা চূড়ান্ত হওয়ার পরও একের পর এক ঝামেলার কারণে দেরি হচ্ছিল; এমনকি বাহ্যত আশা ছেড়েই দিয়েছিলাম—শুধু ধূসর স্বপ্ন হয়ে হৃদয়ের কোণে বেঁচেছিল বলা যায়। গত বছর আশা-নিরাশার মধ্যেই এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হয়েছে। বছরের শেষের দিকে অধিকাংশ সময় অসুস্থই ছিলাম, চিকিৎসার পরও কোনো সুফল পাচ্ছিলাম না। তাই হাওয়া বদলের পরিকল্পনা করলাম। আলমোড়া ও কাশ্মীরের বন্ধুদের কয়েকটি পত্র লিখলাম থাকার বাড়ি ও অন্যান্য ব্যবস্থা করার জন্য। এর মধ্যেই একদিন শুনলাম আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, যার সহায়তায় আমি ফরাসি ভাষা রপ্ত করেছি, প্রফেসর আর্নল্ড শীঘ্রই ইউরোপের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হবেন। মুহূর্তেই চিন্তা করলাম, মিশর ও তুরস্ক সফর, হাওয়া বদল, মি. আর্নল্ডের সাহচর্য—ঘটনাক্রমে সব এক সাথে হয়ে গেছে; এমন সুযোগ হাতছাড়া করা যাবে না। দেরি করলাম না, ছুটলাম তাঁর নিকট। বললাম, আমিও যাব আপনার সাথে। তিনি খুবই খুশি হলেন। বললেন, আপনার সফরের সকল বিষয়ে যতদূর সম্ভব সর্বোচ্চ সহযোগিতা করব।

তখন জাহাজ ছাড়ার মাত্র তিন-চার দিন বাকি। আমার বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন সবাই শুনে খুব অবাক হলেন, প্রায় সবাই আমাকে বুঝাতে চেষ্টা করলেন—হুট করে কোনো রকম প্রস্তুতি ছাড়া এত দীর্ঘ সফরে বেরিয়ে পড়াটা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। আমি উত্তরে বললাম, ‘হার চিহ বাদাবাদ দামন কিশতি দর আব আনদাখতাম’ (আমাকে আমার মতো থাকতে দাও, সমুদ্রে আমার জাহাজ ভাসিয়ে দিয়েছি)।

কলেজে সাধারণত তিন মাস গ্রীষ্মকালীন ছুটি থাকে। আর আমার চাকরির মেয়াদ হিসেবে তিন মাসের ছুটি পাওনা ছিল। দুইয়ে মিলে ছয় মাসের ছুটির ব্যবস্থা হয়ে গেল। ১৮৯২ সালের ২৬শে এপ্রিল আলিগড় থেকে যাত্রা করলাম। মি. আর্নল্ড তাঁর এক বন্ধুর সাথে দেখা করার জন্য দুদিন আগেই রওয়ানা হয়ে গিয়েছিলেন। রাঁচি স্টেশনে তাঁর সাথে মিলিত হলাম। পুরো রাস্তা বেশ আনন্দেই কাটল। মুম্বাইয়ের স্বনামধন্য ব্যবসায়ী ও অত্যন্ত সজ্জন ব্যক্তি হাজি রহমতুল্লাহ বিন দাউদকে মি. আর্নল্ড আগেই পত্রযোগে তাঁর আগমন সম্পর্কে অবহিত করেছিলেন। পত্রে তিনি আমার কথাও উল্লেখ করেছিলেন। সফরসূচিতে কিছুটা পরিবর্তন আনার দরুন নির্ধারিত তারিখের দুদিন পর আমরা মুম্বাই পৌঁছি। মি. আর্নল্ড তাঁর ও আমার বাক্স-পেটরা নিয়ে হোটেল ওয়েস্টিনে গেলেন। আমি বাজারে ঘুরাঘুরি করছিলাম। এক তরুণকে সামনে পেয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তুমি কি হাজি রহমতুল্লাহ সাহেবকে চিন?’

সে আমাকে অবাক করে দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করল, আপনি কি মৌলবি শিবলি? গত দুদিন ধরে আপনাদের জন্য আমরা দুশ্চিন্তায় আছি। চলেন হাজি সাহেব আপনাদের জন্য অপেক্ষা করছেন।

হাজি সাহেব মি. আর্নল্ডকেও হোটেল থেকে নিয়ে গেলেন। আমরা দুজন তাঁর বাগানবাড়িতে উঠলাম।

আমরা যেদিন মুম্বাই পৌঁছি এর দুদিন পরেই জাহাজ ছাড়ার নির্ধারিত দিন ছিল। ফলে মুম্বাইয়ের পুরো সময়টা আমরা সফরসংক্রান্ত বিভিন্ন জরুরি কাজে ব্যস্ত থাকলাম; মুম্বাইয়ের কোনো ইসলামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন বা সংগঠনের সাথে যোগাযোগের সুযোগ হয়নি। কোক কোম্পানির মাধ্যমে আমরা জাহাজের টিকেট সংগ্রহ করলাম। পোর্ট সাইদ পর্যন্ত আমাদের জাহাজের দ্বিতীয় শ্রেণির ভাড়া ছিল দুশো রুপি। ফিরতি টিকেট না কেটে এখানে আমি মারাত্মক একটি ভুল করে ফেললাম। যার মাশুল আমাকে দিতে হয়েছিল ফেরার সময়; পোর্ট সাইদ থেকে মুম্বাই পর্যন্ত একুশ পাউন্ড, অর্থাৎ তিনশত পঁয়ত্রিশ রুপি ভাড়া গুণতে হলো। পহেলা মে সকাল নয়টায় আমরা জাহাজে চড়লাম। জাহাজ যখন নোঙর তুলল তখন প্রায় বারোটা বাজে। ‘বিসমিল্লাহি মাজরেহা ওয়া মুরসাহা’ পড়ে ভারতবর্ষকে খোদা হাফেজ বললাম। দ্বিতীয় শ্রেণিতে মোটে পাঁচ জন যাত্রী ছিল। অবাক করার বিষয় হলো, ঘটনাক্রমে প্রত্যেকেই ছিল ভিন্ন ভিন্ন জাতি ও গোত্রের—একজন মুসলমান, একজন ইংরেজ, একজন ফরাসি, একজন স্প্যানিশ ও একজন নিগ্রো।

 

সমুদ্রের হাওয়া

জাহাজের ঝাঁকুনিতে প্রথম প্রথম কোনো অসুবিধা না হলেও সন্ধ্যার দিকে আর এ অবস্থা থাকল না; শরীর বেশ খারাপ হয়ে গেল। রাতের খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। সকালে যখন চোখ খুললাম, তখন অবস্থা ছিল বেশ অস্বস্তিকর। ঘাড় ও মাথায় এত ব্যথা ছিল যে, তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব না। দুদিন পর্যন্ত বলতে গেলে অচেতনই ছিলাম। জাহাজের কর্মচারীরা মাঝে মাঝে শরবত নিয়ে এসে বলত, একটু খেয়ে নিন। কিন্তু এগুলো দেখেই আমার পেট গুলিয়ে আসত। কষ্ট হলেও মি. আর্নল্ড শুধু চা-টুকু পান করতেন, তা-ও টিকত না তার পেটে, তবে বমি করার পর তাঁর শরীর খুব হালকা মনে হতো। মি. আর্নল্ডের পীড়াপীড়িতে আমিও দু-এক বার চা পান করলাম, এতে বমি হলে আমিও বেশ হালকা বোধ করলাম। তৃতীয় দিন আমরা সুস্থতা অনুভব করলাম এবং পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে উঠলাম। সবসময় শুনে এসেছি, সমুদ্রের হাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য খুবই উপকারী। আসলেই সমুদ্রযাত্রা শত চিকিৎসার মতো একটি চিকিৎসা। জাহাজে আরোহণ করার আগেও আমার শরীর বেশ দুর্বল ও ভগ্নস্বাস্থ্য ছিল; কিন্তু দিনদিন শক্তি-সামর্থ্য ও উৎফুল্লভাব ফিরে আসছিল। মানসিকভাবেও বেশ ফুরফুরে থাকতাম। ক্ষুধাও লাগত বেশি। আমাদেরকে দৈনিক পাঁচবার খাবার দেওয়া হতো; সকাল আটটায় চা-এর সাথে দুটো বিস্কুট, এগারোটায় স্বাভাবিক খাবার যাতে বিভিন্ন ধরনের তরকারি থাকত, একটার সময় টিফিন, বিকাল পাঁচটায় রাতের খাবার যাতে সাধারণ মাংস ছাড়াও মোরগ, হাঁস, কবুতরের মাংস, তাজা এবং শুকনো ফলফলাদি থাকত এবং রাত নয়টায় চা আর মাখন। প্রতিবারের খাবারই পেট ভরে খেতাম এবং খুব ভালোভাবে পরিপাকও হয়ে যেত।

 

আরবি ভাষার প্রতি একজন খ্রিস্টানের বৈরিতা

আমি সারা দিন বসে বসে সমুদ্রের ঢেউ আর রং-তামাশা দেখতাম। মি. আর্নল্ড আরবি শেখা শুরু করেছিলেন। আমাদের সাথে স্পেনের যে খ্রিষ্টান লোকটি ছিল, সে তাঁর আরবি পড়া দেখে বেজায় চটত; তাঁর আরবি পড়ার সময় প্রায়ই লোকটি আসত এবং খুবই ঘৃণা ও অবজ্ঞার সাথে ব্যঙ্গ করে আরবি বর্ণমালাগুলো আউড়াত আর বলত, ‘এই ভাষা তো উটের ভাষা’। এরকম আচরণে আমার প্রচণ্ড রাগ হলেও মনে মনে ভাবতাম, যে জাতি শত শত বছর আরবদের পদতলে লাঞ্ছনার জীবন কাটিয়েছে, তাদের কাছে এর চেয়ে ভালো আচরণ কীভাবে আশা করা যায়!

 

পাখি জাতীয় প্রাণী জবাই করা হত

সাধারণভাবে একটি কথা প্রসিদ্ধ ছিল যে, জাহাজে যেসব পাখপাখালির মাংস খাওয়ানো হয় সেগুলো জবাই করা হয় না। মৌলবি সামিউল্লাহ খান সাহেব তাঁর সফরনামায় অভিজ্ঞতা থেকে বিষয়টি সত্য বলেছেন। আমি প্রথম দু-তিন দিন পাখির মাংস খাওয়া থেকে বিরত থাকি। মি. আর্নল্ড এর কারণ জানতে চাইলে বললাম, আমাদের ধর্মে জবাই ছাড়া প্রাণী খাওয়া নিষিদ্ধ। তিনি বললেন, এই জাহাজে পাখপাখালি জবাই করা হয়; ঘাড় মটকে মারা হয় না। যেহেতু তাঁর একার সাক্ষ্য শরিয়ত মতে যথেষ্ট নয়, তাই আমি বিষয়টি নিজেই যাচাই করার জন্য গেলাম। জবাইকারী ছিল একজন খ্রিষ্টান, জবাই করার সময় সে কিছু পড়ত না, শুধু গলায় ছুরি চালিয়ে দিত। হানাফি মাজহাবে এই ধরনের জবাই হালাল নয় বিধায় আমি কয়েকদিনের জন্য শাফেয়ি বনে গেলাম; যাদের মতে সবধরনের জবাই হালাল।

জাহাজে মি. আর্নল্ড আলিগড়ের সেই আর্নল্ড ছিলেন না; ছিলেন সম্পূর্ণ অন্য এক মানুষ। ছিল না তার সেই গাম্ভীর্য; ছিল বাধাহীন উচ্ছলতা। অধিকাংশ সময় হাসি-ঠাট্টা করতেন, শিশুদের সাথে খেলাধুলায় মেতে উঠতেন এবং জাহাজের ডেকে লাফালাফি করতেন। আমিও এই সফর নিয়ে একটি কবিতা লেখা শুরু করেছিলাম। আসলে সমুদ্রের পরিবেশ এতটাই মনোরম আর হৃদয়গ্রাহী যে, কোনো ভারিক্কি স্বভাবের মানুষও সমুদ্রযাত্রায় অযথা হইচইয়ে মেতে উঠবে।

 

সোমালিয়ানদের উচ্ছৃঙ্খল আচরণ

৭ মে ১৮৯২ আমাদের জাহাজ এডেন বন্দরে তীর থেকে কিছুটা দূরে নোঙর ফেলল। এডেনে প্রথমেই নজরে পড়ার মতো বিষয় হলো এখানে একদল সোমালিয়ান কিশোর ডিঙি নৌকায় করে জাহাজের কাছাকাছি আসে এবং অদ্ভুত সব অঙ্গভঙ্গি করে। কেউ নাচে, কেউ গান গায়, কেউ নিজেদের মধ্যে অর্থহীন কিছু বাক্য আওড়ায় আর হাসাহাসি করে। মজার ব্যাপার হলো, লোকজন দু-চার আনা পয়সা যা দিতে চায় সাগরে ছুড়ে মারে আর ওরা ডুব দিয়েই তুলে ফেলে। ইংরেজদের অধিকাংশই এই রংতামাশায় ব্যস্ত ছিল, মি. আর্নল্ডও তা দেখে বেশ মজা পাচ্ছিলেন। কিন্তু আমার অবস্থা ছিল ভিন্ন; আমি ভুলবশত ভেবেছিলাম এ অঞ্চল প্রধানত আরব অধ্যুষিত, ফলে স্বভাবতই তাদের প্রতি ছিল সম্মান ও ভালোবাসার দৃষ্টি; কিন্তু সামান্য ভিক্ষার জন্য তাদেরকে এভাবে অর্থহীন বিচিত্র অঙ্গভঙ্গি করতে দেখে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিলাম না। ভিন্ন জাতির লোকের কাছে এভাবে হাত পাততে লজ্জা হয় না? মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে উঠল, চোখের পানি ধরে রাখতে পারলাম না। আনমনে মুখ থেকে বেরিয়ে এল, ‘ওঠো হে উমর’। আর্নল্ড আমার পাশেই ছিলেন, আমার এই পরিবর্তন, হৃদয়ের এই আলোড়ন তিনি লক্ষ করছিলেন। আমি তাঁকে আমার মানসিক অবস্থা ও এর কারণ বললাম। তিনি আমার দিকে শুধু চোখ তুলে একবার তাকালেন, আর কোনো কথা বললেন না। শহরে গিয়ে আমি খোঁজখবর নিয়ে নিশ্চিত হলাম সোমালিয়ানরা আসলে আরব নয়, তখন কিছুটা আশ্বস্ত হলাম। আমার ভ্রমণ-কাব্যে এই হতভাগা জাতিকে কটাক্ষ করেছি মূলত এই বিরাগ থেকেই; প্রকৃতপক্ষেই ওরা এর যোগ্য। সময় খুব কম ছিল, তাই শহরের ভেতরের দিকে আমাদের দেখার সুযোগ হয়নি। এখান থেকে ভারতে পত্র লিখলাম। একটি পত্রের শিরোনামে তাৎক্ষণিক এই কবিতাটি লিখেছিলাম—

এই সফরের জন্য যখন কোমর বেঁধে নামলাম,

শত্রু-মিত্র উভয়ই ধাঁধায় পড়ে গেল,

সবাই অবাক, বলল: কী লাভ তোমার এতে?

কেন তুমি এই শ্বাপদসংকুল পথে বের হলে?

জনে জনে উপদেশ-বাণীতে জর্জরিত করল বিলক্ষণ,

যা বলার বলে গেল,

আমার শব্দগুলো পর্দার পেছনে মাথা কুটে মরছিল।

যখন তারা পীড়াপীড়ির সীমা অতিক্রম করল, বললাম: অনেক হয়েছে!

এবার থামো, আমি আমার তরি সায়রে ভাসিয়েছি।

(ফার্সি থেকে অনূদিত)

 

এডেনের ভাষা

এডেনের প্রচলিত ভাষা আরবি। তবে পার্সিয়ান, হিন্দু ও বাঙালি যারা ব্যবসার উদ্দেশ্যে এখানে বসবাস করেন তারাও অনর্গল আরবি বলতে পারেন। যেহেতু আমার জীবনে কখনো কোনো হিন্দুকে আরবি বলতে শুনিনি, তাই খুব স্বাভাবিকভাবেই এসব হিন্দু বণিক-সওদাগরদের “আইনা তারুহ? মা তাবগি? (কোথায় যাচ্ছ? কী চাও?) বলতে দেখে অদ্ভুত মজা পেতাম।

এখানকার ভাষা আরবি হলেও তা খুবই বিদঘুটে ও অশুদ্ধ। আজকাল আরবি ভাষাভাষী অঞ্চলেও আগের সেই আরবি নেই, কিন্তু এডেনের এই আরবি সবচেয়ে অদ্ভুত। দু-চারটা মামুলি বাক্য ছাড়া কিছুই বুঝতে পারিনি। সম্ভবত দীর্ঘকাল বহিরাগতদের বসবাস ও স্থানীয়দের সাথে সংমিশ্রণের ফলে এখানকার ভাষার এ অবস্থা হয়েছে। আল্লামা মুকাদ্দাসি আরবের বিখ্যাত পরিব্রাজক ছিলেন। তিনি চতুর্থ শতাব্দীর প্রথম দিকে বিশ্ব ভ্রমণ করেছিলেন। তিনি তাঁর ভূগোলে লিখেছেন, ‘এডেনে বসবাসকারী জাতিগুলোর অধিকাংশই পার্সিয়ান।’ তিনি আরও লিখেছেন, ‘এখানে সাধারণত “জিম” এর পরিবর্তে “কাফ” এবং “জিলিয়া” এর পরিবর্তে “রাজলিনা” উচ্চারণ করা হয়।’ তাঁর যুগেই যদি এই অবস্থা হয় তাহলে মিরাঠি আর গুজরাটিদের দীর্ঘ দিন এখানে বসবাস ও মেলামেশার পর এখানকার ভাষা নিয়ে অভিযোগ করার আর কী আছে!

 

এডেনের অদ্ভুত বানর

এডেন থেকে এক জার্মান আমাদের সাথে উঠলেন। তিনি ছিলেন জার্মানির বিখ্যাত একটি চিড়িয়াখানার কর্মকর্তা। লম্বা সময় এই অঞ্চলে ঘুরেফিরে এখন দেশে ফিরছেন। ঘুরাঘুরি ও ব্যবসাবাণিজ্যের বদৌলতে তিনি বিভিন্ন ভাষায় অনর্গল কথা বলতে পারেন। তিনি যখন জাহাজের কর্মকর্তাদের সাথে ইটালিয়ান, আর্নল্ডের সাথে ইংরেজি আর আমার সাথে আরবিতে কথা বলতেন, তখন আমি ভীষণ অবাক হতাম; একরকম ধাঁধার মধ্যে পড়ে যেতাম। খাওয়ার টেবিলে যখন একত্রিত হতাম তখন তিনি একাই সবার দোভাষীর দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতেন। তিনি আফ্রিকার জঙ্গল থেকে দুর্লভ ও চমৎকার অনেক পশু-পাখি নিয়ে এসেছিলেন। একটি খাঁচায় আফ্রিকার কিছু বানর ছিল, যেগুলোর আকৃতি সাধারণ বানরের চেয়ে কিছুটা ভিন্ন। সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হলো জন্তুটি কাউকে কাছে আসতে দেখলে যখন কিচির-মিচির করত তখন মনে হতো নির্দিষ্ট কিছু অক্ষর উচ্চারণ করছে। প্রথমে আমি মনে করেছিলাম এটা বিড়ালের মিউমিউয়ের মতো একটি আওয়াজ মাত্র, কিন্তু কাছে থেকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে দেখলাম পরিষ্কার ‘লাম’ এবং ‘ইয়া ইয়া’ উচ্চারণ করে। এমনকি কেউ যদি আড়াল থেকে এই আওয়াজ শুনে তাহলে বুঝতেই পারবে না যে এটা বানরের আওয়াজ। বিষয়টি আমি মি. আর্নল্ডের সাথে আলোচনা করলে তিনিও সহমত পোষণ করলেন। সম্ভবত এ কারণেই ইউরোপের কেউ কেউ মনে করেন যে, বানর কথা বলতে পারে। শোনা যায় এক ব্যক্তি দীর্ঘ দিন গবেষণা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে এই ভাষার কতিপয় বর্ণও উদ্ভাবন করেছিলেন।

 

অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি ও মি. আর্নল্ডের দৃঢ়তা

এডেন থেকে বিনোদনের নতুন উপাদান যোগ হওয়ায় আমরা বেশ খোশমেজাজেই সফর করছিলাম। কিন্তু দ্বিতীয় দিন এক বিপজ্জনক পরিস্থিতির সম্মুখীন হলাম, যা আমাদেরকে কিছু সময়ের জন্য মারাত্মক দুশ্চিন্তায় ফেলে দিয়েছিল। জাহাজের ইঞ্জিন বিকল হয়ে গেছে, ১০ মে সকালে ঘুম থেকে উঠেই সহযাত্রীর কাছে এই সংবাদ শুনলাম। দেখলাম আসলেই জাহাজের ক্যাপ্টেন ও নাবিকরা ছুটোছুটি করছে। সবার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। তারা জাহাজ মেরামত করার প্রাণপণ চেষ্টা করছে। জাহাজ বাতাসের ধাক্কায় খুব ধীরে এগুচ্ছে। আমি খুব ঘাবড়ে গেলাম। অজানা সব শঙ্কা মাথায় ভিড় করতে লাগল। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে ছুটে গেলাম মি. আর্নল্ডের কাছে। দেখলাম দিব্যি তিনি বসে গভীর মনোযোগের সাথে বই পড়ছেন।

বললাম, ‘আপনি জানেন কিছু?’ তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, জানি; জাহাজের ইঞ্জিন বিকল হয়ে গেছে।’ বললাম, ‘আপনার কোনো ভয় নেই? এটা কি পড়ার সময়?’ তিনি বললেন, ‘জাহাজ যদি বিকল হয়েই যায় তাহলে এই সামান্য সময়ও গুরুত্বপূর্ণ। এই মূল্যবান সময় অযথা নষ্ট করা কোনো বুদ্ধিমানের কাজ নয়।’ তাঁর এই পাহাড়সম মনোবল ও অসীম সাহসিকতা দেখে আমারও ভীতি কেটে গেল। প্রায় আট ঘণ্টা পর জাহাজ সচল হলো। আবারো আগের মতোই ছুটে চলল গন্তব্য পানে।

১৩ মে জাহাজ সুয়েজ খালে এসে পৌঁছায় এবং এখানে তিন ঘণ্টার জন্য যাত্রা বিরতি করে। এখানে মিসরীয় আরব ফেরিওয়ালারা রুটি, খেজুর, পনির ইত্যাদি বিক্রির জন্য নিয়ে আসে। আমি ভারতবর্ষ থেকে এসেছি এদের একজন এটা বুঝতে পেরে আমার সাথে উর্দুতে কথা বলতে শুরু করে। আমি অবাক হলাম। আরও অবাক হলাম যখন জানলাম সে কোনোদিন ভারতবর্ষের চেহারাও দেখেনি। বিশ্বব্যাপী উর্দু ভাষার প্রচার দেখে আমি আরও অবাক হলাম।

১৪ মে আমরা পোর্ট সাইদে পৌঁছলাম। এখানে অত্যন্ত দুঃখভারাক্রান্ত মনে মি. আর্নল্ডকে বিদায় দিতে হয়। মুম্বাই থেকে আমি ব্রিনদিশি পর্যন্ত টিকেট নিয়েছিলাম। কিন্তু পোর্ট সাইদ-এ এসে চিন্তা করলাম ব্রিনদিশি পর্যন্ত তো মি. আর্নল্ডের সাথে যেতে পারব, তবে ওখান থেকে ইস্তাম্বুল এক সপ্তাহের পথ—এই সময়টা সম্পূর্ণ অপরিচিত লোকজনদের সাথে কাটাতে হবে, অজ্ঞাত ভাষা ও দেশের মানুষের সাথে চলতে সবক্ষেত্রেই বেশ অসুবিধার সম্মুখীন হতে হবে—এই চিন্তা থেকেই আগের পরিকল্পনা সম্পূর্ণ পরিবর্তন করে সিরিয়ার পথ ধরে ইস্তাম্বুল যাওয়ার জন্য মনস্থির করলাম। জাহাজ নোঙর করার পর কোক কোম্পানির প্রতিনিধিরা নিজেদের যাত্রীদের খোঁজখবর নেওয়ার জন্য জাহাজে ওঠে। জাহাজকে তীর থেকে বেশ দূরেই থামতে হয়। এ জন্য যাত্রীদের নামার জন্য কোক কোম্পানির পক্ষ থেকে ছোট ছোট নৌকা সবসময় প্রস্তুত থাকে। এসব বন্দরে জাহাজ থেকে নামার সময় অনভিজ্ঞ লোকজন মারাত্মক ঝামেলায় পড়েন। নোঙর করার সাথে সাথে কুলি-মাল্লার দল একসাথে হামলে পড়ে। এতে যাত্রীরা পড়েন কঠিন বিপদে। এই ভিড়, হট্টগোল আর মালামাল টানাহেঁচড়ায় যাত্রীদের নাভিশ্বাস উঠে যায়। এখানেই শেষ নয়; শত ঝামেলা ঠেলে তীরে উঠার পর ঘাটের ভাড়া মেটানোর দরকষাকষি, ঠ্যালাঠেলি তো আছেই। এসব ঝামেলা এড়ানোর উত্তম পন্থা হলো কোক কোম্পানির কর্মচারী ছাড়া আর কারো সাথে কোনো ধরনের লেনদেনে না জড়ানো।

আমরা তীরে উঠার পর স্যামুয়েল এসে হ্যান্ডশেইক করল। সে আগে থেকেই দাঁড়িয়েছিল। এই ইহুদি লোকটি কোক কোম্পানির পক্ষ থেকে যাত্রীদের দেখভাল করার জন্য নিয়োজিত। সে অনেকগুলো ভাষায় কথা বলতে পারে, বিশেষ করে আরবি, ইংরেজি ও ফরাসি অনর্গল বলতে পারে। তাকে উর্দুতে কথা বলতে দেখে আমি খুব মজা পেলাম। কারণ, সে ভারতবর্ষেও কিছুদিন ছিল। আমি তার সাথে কোম্পানির অফিসে গেলাম। সমুদ্রের তীরঘেঁষা অফিসটি চমৎকার, ঝকঝকে চেয়ার-টেবিল দিয়ে সজ্জিত। টেবিলের উপর অনেকগুলো পত্রপত্রিকা, যার অধিকাংশই জাহাজ সম্পর্কিত পত্রিকা ও ম্যাগাজিন। এখানে প্রথমেই আমি আমার টিকেট পরিবর্তন করার ব্যাপারে কথা বললাম। জানতে চাইলাম, এখানে নেমে ইস্তাম্বুলের টিকেট নিলে ব্রিনদিশি পর্যন্ত যে টিকেট নিয়েছি তার অতিরিক্ত ভাড়া ফেরত দেওয়ার সুযোগ আছে কি না। স্যামুয়েল এর সমাধান না দিতে পেরে বড়ো অফিসে গেল জানতে। এসে জানাল যে, এই টিকেটে আমার ইস্তাম্বুল পর্যন্ত যাওয়ার সুযোগ আছে। শুধু আরো দুই পাউন্ড, অর্থাৎ বত্রিশ রুপি দিতে হবে। শুনে খুব খুশি হলাম। কথা বলার মধ্যেই আট রুপি অগ্রিম পরিশোধ করে দিলাম। সৌভাগ্যক্রমে ইস্তাম্বুলের জাহাজও তখন প্রস্তুত ছিল, নাহয় পোর্ট সাইদে আমাকে পনেরো দিন অপেক্ষা করতে হতো।

 

পোর্ট সাইদ

পোর্ট সাইদ বেশ চমৎকার ছিমছাম ছোট্ট একটি বন্দর। এর আবাসিক এলাকা দু-ভাগে বিভক্ত। সমুদ্রের তীর লাগোয়া অংশে সাধারণত ইউরোপিয়ানরা বসবাস করে। এ অংশে বড়ো বড়ো হোটেল, কফিহাউজ, থিয়েটার ইত্যাদি। একটি কফিহাউজ দেখলাম একবারে সমুদ্র সৈকতের ওপর। মর্মর পাথরের চমৎকার ছোটো ছোটো টেবিল ঘিরে সুবিন্যস্তভাবে সাজানো চেয়ার। চা, কফি, টোস্ট, মাখন ইত্যাদি সবসময় রেডি। এই অংশে প্রচুর দোকানপাট এবং সবগুলোই বিলাসবহুল ও পরিপাটি। অপর অংশে এখানকার আদি বাসিন্দাদের বসবাস। কিন্তু এর অবস্থা করুণ, সবকিছুই জীর্ণ, বিবর্ণ; বিলাসবহুল হোটেলের পরিবর্তে শুধু বাবুর্চিদের নোংরা দোকানপাট।

আমি এই শহরে ঘুরতে বের হয়ে প্রথমে সবকিছু খুব আগ্রহ ও কৌতূহল সহকারে দেখছিলাম। কারণ, ইসলামি সাম্রাজ্যভুক্ত কোনো দেশ দেখার এটাই আমার প্রথম সুযোগ ছিল। (ইতোপূর্বে আমার মক্কা-মদিনা যাওয়ার সুযোগ হলেও সেটা ছিল আল্লাহর দেশ; এখানে আমি পার্থিব সাম্রাজ্য আর রাষ্ট্রের কথা বলছি।) কোনো বিলাসবহুল সুউচ্চ ভবন দেখলে এই ভেবে খুশি হতাম যে, আলহামদুলিল্লাহ, দেশে দেশে মুসলমানরা সুখে-শান্তিতে আছে। কিন্তু খোঁজখবর নিয়ে যখনই জানতাম এগুলোর মালিক কোনো ইউরোপীয়ান, পুরো শহরে যত বিলাসবহুল সুউচ্চ ভবন আছে এর একটাও কোনো মুসলমানের মালিকানাধীন নয়; তখন কেবল আফসোসই হতো—‘বহর জমিন রসিদম আসমা পয়দাস্​ত’ (পৃথিবীর যেখানেই গেলাম, কেবল আকাশের দেখা পেলাম)। তবে ইউরোপীয়ান বসতির শেষ প্রান্তে অত্যন্ত চমৎকার ও সুরম্য একটি মসজিদ দেখতে পেলাম।

বাজারে কিছুক্ষণ ঘুরাঘুরির পর ইস্তাম্বুলের জাহাজে উঠলাম। স্যামুয়েল ও মি. আর্নল্ড আমার সাথে ছিলেন। তখন বায়তুল মুকাদ্দাসের হজ্জের মৌসুম ছিল, তাই প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণি দুটোই খ্রিষ্টান হাজিদের দ্বারা পরিপূর্ণ ছিল। মি. আর্নল্ড বললেন, ‘আমার ভয় হচ্ছে এসব লোকের আচরণে আপনার কষ্ট হয় কি না। এদের মধ্যে গোঁড়ামি থাকাটা খুবই স্বাভাবিক; ভিন্ন ধর্ম ভিন্ন জাতি—এরা আপনার মর্যাদা বুঝবে কীভাবে।’ কিন্তু পরবর্তী অভিজ্ঞতায় দেখলাম মি. আর্নল্ডের ধারণা সঠিক ছিল না। লোকগুলো ধার্মিক ঠিকই, কিন্তু সবাই স্পেন ও ইতালির অধিবাসী; ব্রিটিশ নয়। এ জন্যই বিজয়ী আর পরাজিত জাতির মধ্যে প্রভেদের যে দেয়াল, যা প্রকাশ করা বিজয়ী জাতির এক অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য, তা এদের মধ্যে দেখা যায়নি। মি. আর্নল্ড এখানেই বিদায় নিলেন, তাকে খোদাহাফেজ বললাম। আর তখন ভাবছিলাম, দেখা যাক এখন একাকীত্বের সময়গুলো কীভাবে কাটে।

১৫ মে জাহাজ জাফফা প্রণালিতে পৌঁছাল। আমার সহযাত্রীরা বেশিরভাগই এখানে নেমে গেল। বায়তুল মুকাদ্দাস এখান থেকে এক রাতের পথ। সময় কম থাকায় এখানে আর নামা হলো না।

 

বৈরুতে এক ঝলক

১৬ মে বৈরুত পৌঁছলাম। স্বাভাবিকভাবে জাহাজ এখানে কমপক্ষে দুপুর পর্যন্ত যাত্রা বিরতি করে। এই ঐতিহাসিক ও সুপ্রাচীন শহরটি দেখার দীর্ঘ দিনের সাধ ছিল। তবে তীরে এসে খুবই মর্মাহত হলাম। এখানে পাসপোর্ট ছাড়া কাউকে নামতে দেওয়া হয় না। ভারত থেকে আমি তাড়াহুড়ো করে রওনা হওয়ার কারণে পাসপোর্ট সংগ্রহ করতে পারিনি। শেষ পর্যন্ত বৈরুত না দেখার আফসোস থেকেই যাবে—এই ভেবে খুবই ঘাবড়ে গেলাম। আবারো চিন্তা করলাম কী করা যায়। এবার লোকগুলোকে গিয়ে বললাম, ‘আমি এখানে অবস্থান করব না, শুধু ঘুরে চলে আসব; যেতে দিলে খুব ভালো হয়।’ আল্লাহই জানেন ওরা কীভাবে বুঝতে পারল যে, আমি ভারতীয়। দরিদ্র এক দেশের নাগরিক মনে করে তারা আমার প্রতি দয়া করল। আমাকে অনুমতি দিল এবং শহর ঘুরিয়ে দেখানোর জন্য সাথে একজন লোকও দিয়ে দিল। আমার আগে থেকেই পরিকল্পনা ছিল ইস্তাম্বুল থেকে ফেরার পথে এখানে দু-এক দিন অবস্থান করব, তাই কোনোমতে বাজারঘাট ঘুরে দেখলাম। বইয়ের মার্কেটে গেলাম। রাজপথের পাশে একটি কফিহাউজে কিছুক্ষণ বসলাম। বসে বসে রাস্তায় চলাচলকারীদের ভালোভাবে লক্ষ করছিলাম। গাড়ি বা ঘোড়ায় চড়ে কাউকে জাঁকজমকের সাথে যেতে দেখলে আমার সাথে থাকা গাইডকে জিজ্ঞেস করতাম, ‘তিনি কে?’ তার জবাবের বেশিরভাগেই ছিল, ‘তিনি একজন খ্রিষ্টান ভদ্রলোক।’

এখানে যে বিষয়টি সবচেয়ে ভালো লেগেছে তা হলো, ব্যবসায়ীরা সবাই বেশ সচ্ছল। এমনকি কুলি-মজুররাও খুবই হাসিখুশি, বেশভূষায় পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি। তিন-চার ঘণ্টা শহরে ঘুরে ফিরে এলাম। একটি আধুলি গাইডকে বখশিশ দিয়ে আবার জাহাজে চড়লাম।

 

পোর্ট সাইদ থেকে ভ্রমণের নতুন অভিজ্ঞতা

পোর্ট সাইদ থেকে যাত্রা শুরু করার পর নতুন যা যোগ হলো তা হলো, এখানে দু-একজন মুসলমানের দেখা পাওয়া গেল, আর বৈরুতে তো পুরো জাহাজ সিরিয়ান-আরব দিয়ে ভরে যায়; অথচ মুম্বাই থেকে পোর্ট সাইদ পর্যন্ত কোনো মুসলমানের দেখা মেলেনি। দুর্ভাগ্যবশত প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে এই সৌভাগ্য না হলেও তৃতীয় শ্রেণিতে চতুর্দিকে শুধু মুসলমানই দেখা গেল। আমি যাত্রার শুরু থেকেই মুসলমানের চেহারা দেখার জন্য লালায়িত ছিলাম। এখানে এই জমায়েত দেখে আনন্দে বুকটা ভরে গেল। প্রথম শ্রেণির ছাদ ছিল বেশ ঝকঝকে, খোলামেলা ও প্রশস্ত। অধিকাংশ সময় আমি এখানে বসেই সমুদ্রের দৃশ্য উপভোগ করতাম। কিন্তু এই সংসর্গের সুযোগ আসার পর আমি ওদিকে ভুলেও আর পা বাড়াইনি। প্রথম প্রথম এই লোকগুলোর সাথে আমার ভাব জমাতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। তারা দুজন-চারজন করে ছাদে বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসেছিল। আমি বড়ো আগ্রহ নিয়ে তাদের কাছে যেতাম, তারা আমাকে ভ্রুক্ষেপও করত না। যার কাছেই গিয়ে দাঁড়াতাম সে-ই একবার আমার দিকে তাকিয়ে মাথা নিচু করে ফেলত। তাদের এই বিরূপ আচরণে আমি খুবই অবাক হলাম। মনে মনে ভাবলাম, জীবনে আরবদের আতিথেয়তার কত গল্প শুনলাম, অথচ এই লোকগুলো দেখি কথা বলতেও কার্পণ্য করে। মিলিটারি কলেজের কিছু শিক্ষার্থী ছুটিতে দেশে এসেছিল, এখন ইস্তাম্বুল ফিরে যাচ্ছে। তারা মনের আনন্দে মাঝে মাঝে আরবি কবিতা আবৃত্তি করছিল। চিন্তা করলাম জ্ঞানভিত্তিক কিছু আলোচনা করে তাদের সাথে পরিচিত হবো—এ চিন্তা থেকেই তাদের কাছে গিয়ে বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞানগর্ভমূলক কথা বলে নিজের পাণ্ডিত্য জাহির করতে লাগলাম। এরপরও তারা আমার দিকে ভ্রুক্ষেপ করল না। কষ্টে আমি ব্যাগপত্র নিয়ে চলে এলাম। আমার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল এর পেছনে অবশ্যই বিশেষ কোনো কারণ আছে। ঘটনাক্রমে একসময় এক লোক আমাকে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনার ধর্ম কী?’ আমি বললাম, ‘ইসলাম।’ সে বলল, ‘এটা হতে পারে না, মুসলমানের টুপি কীভাবে এইরকম হয়!’ দুর্ভাগ্যবশত আমার মাথায় ইরানি টুপি ছিল, ফলে সবাই আমাকে খ্রিষ্টান হিসেবে ধরে নিয়েছিল। এই রহস্য উদঘাটিত হওয়ার পর আমি লোকজনের এই সন্দেহ পুরোপুরি দূর করতে সক্ষম হলাম। এরপর তাদের সাথে এতটাই হৃদ্যতা হয়েছিল যে, তারা আমাকে ছেড়ে কোথাও যেতে চাইত না। মিলিটারি কলেজের ছাত্রদের সাথে বেশ আন্তরিকতা সৃষ্টি হলো। তারা সবসময় আমার সাথে লেগেই থাকত। আমিও এই সুযোগটি কাজে লাগালাম; প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে ইস্তাম্বুল সম্পর্কে খুঁটিনাটি অনেক কিছুই জেনে নিলাম। বাস্তবে এই তথ্যগুলো আমার খুবই কাজে লেগেছিল।

 

চলবে…

বিজ্ঞাপন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments