স্কুলে, বাংলা বিষয়ের স্যার একদিন আমাকে দাঁড় করিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, বড় হয়ে আমি কী হতে চাই। সেদিন অবশ্য আমি একা নই, ক্লাসের আরও অনেককেই এই প্রশ্নটা করা হয়েছিল। সকলের উত্তরগুলো ছিল গতানুগতিক—বাংলা রচনা কিংবা ইংরেজি Essay যেভাবে শিখেছিলাম আমরা ঠিক সেরকম। ক্লাসের সকলের পছন্দের পেশা ছিল দুটো—হয় ডাক্তার হয়ে গ্রামে ফিরে এসে গরিব মানুষদের সেবা করা, না হয় শিক্ষক হয়ে জাতির মেরুদণ্ড গঠনের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেওয়া।
ক্লাসে সেদিন একমাত্র আমিই ছিলাম ব্যতিক্রম। স্যারের প্রশ্নের প্রত্যুত্তরে বলেছিলাম, ‘বড় হয়ে আমি সাংবাদিক হতে চাই।’
শহর থেকে বহুদূরে, মফস্বলের অজপাড়াগাঁর কোনো এক অখ্যাত স্কুলের বেঞ্চিতে বসে একটা ছেলে সাংবাদিক হতে চায়—ব্যাপারটা যেন যেমনই রহস্যময়, তেমনই কৌতুককর। যদি তা না-ই বা হবে, তাহলে সহপাঠীরা সেদিন কেন সদলবলে স্কুল ছুটির পর ঝাঁকে ঝাঁকে এসে আমার কাছে জানতে চাইবে সাংবাদিক হওয়ার কথা আমি কোথায় পড়েছি, কোন বইতে, কোন রচনায়? তাদের ধারণা ছিল, যেন-বা আমি তাদের মতো কোনো মুখস্থবিদ্যা উদ্গিরণ করে দিয়েছি।
না, আমি সেদিন কোনো মুখস্থবিদ্যা কপচাইনি। শ্রেণিকক্ষের রোল নম্বর বা মেধাক্রম অনুসারে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার কিংবা বাংলা রচনার চিরাচরিত সেই শিক্ষক হওয়ার বাসনাও কোনোদিন আমার মনে দাগ কাটেনি। সেই চপল কিশোর বয়সেই আমি বুঝতে পেরেছিলাম, সৃজনশীল সৃষ্টিকর্মের প্রতি আমার আছে দুর্নিবার আকর্ষণ। তবে বিভিন্ন গোয়েন্দা সিরিজ আর ছোটদের বইপত্র পড়ে ধারণা হয়েছিল, সাসপেন্স, অ্যাডভেঞ্চার আর দুঃসাহসী সব অভিযানের গল্প তৈরি হয় সাংবাদিকতার হাত ধরে।
তা মিথ্যে নয়। জগতের বহু সাংবাদিকই পরে নামকরা লেখক হয়েছেন। আমার কিশোর মন সাংবাদিক হতে চাইলেও, আরও গহিনে হয়তো আমি আসলে লেখকই হতে চেয়েছিলাম।
লিখতে বসেছি ‘কেন লিখি’ এই শিরোনামে। কিন্তু মনে হলো, লেখালেখিকে কীভাবে বুঝতাম সেই গল্পটাও যদি একফাঁকে করে নেওয়া যায়, মন্দ হয় না।
কথা হলো, কেন লিখি?
লিখি আসলে নিজের ভাবনাগুলোকে শব্দচিত্র দিতে। শব্দচিত্র শব্দটা নতুন ঠেকতে পারে কারও কারও কাছে। একজন শিল্পী যেমন তার ভাবনাকে রংতুলির আঁচড়ে ফুটিয়ে তোলেন, একজন লেখকও তার হৃদয়ের ভাবনাকে ফুটিয়ে তোলেন শব্দের তুলিতে। লেখক যখন শব্দের পর শব্দ দিয়ে বুনন করেন তার কল্পনার চিত্রটিকে, তখন কাগজে ভেসে থাকা সেই শব্দগুলো জীবন্ত হয়ে ধরা দেয় তার চোখে। সেই শব্দেরা কখনো হাসে, কখনো কাঁদে। কখনো-বা ভাসিয়ে নিয়ে যায় ভীষণ ভাবাবেগে।
লিখি তো হৃদয়ের ভাষাকে জাগ্রত করার বাসনা থেকেই। তবে, সেই বাসনায় যখন সত্য আর সুন্দরের সংমিশ্রণ ঘটে যায়, মানে—যখন রবের প্রতি বিনীত নিবেদনের নিগূঢ় উপায় হয়ে ওঠে হৃদয় থেকে উৎসারিত শব্দেরা, তখন সেটা আর বাসনা থাকে না। সেটা হয়ে ওঠে নেশা।
এখন লেখালেখি আমার কাছে নেশার মতো। সত্য আর সুন্দরের সুমহান ডাক চতুর্দিকে বাতাসের মতো ছড়িয়ে দেওয়ার কাজে এক অনন্য হাতিয়ার। কিশোরবেলায় আমি বলেছিলাম, আমি সাংবাদিক হতে চাই। সাংবাদিকের কাজ যদি হয় সংবাদ পৌঁছে দেওয়া, তাহলে এক অর্থে আমি তো সাংবাদিকই। আমিও তো প্রিয়তম রবের প্রিয় কথাগুলো পৌঁছে দিতে চাই মানুষের দ্বারে দ্বারে, হৃদয় থেকে হৃদয়ে…