পুরানা জীবনের চাঁদগুলি জুলাইয়ের মতো জ্বলজ্বলে

মুহিম মাহফুজ

হাটহাজারির বছর আমি প্রথম জানতে পারি, কওমি মাদরাসার পরিবেশে বাংলা বই-পত্র-পত্রিকা প্রায় নিষিদ্ধ থাকার পরও ছাত্র-শিক্ষকদের একান্ত লুকানো সংগ্রামে ভাষা ও সাহিত্যচর্চার একটি উত্তেজক আবহাওয়া মধ্যম গতিতে বিরাজ করছে। আমার আশৈশব পড়াশোনা কওমি মাদরাসায় হলেও সাহিত্যচর্চার এই শহুরে স্রোত সম্পর্কে আমি চাক্ষুষ সাক্ষী ছিলাম না। কারন ছিলো।

শর্ট কোর্স বা মাদানি নেসাবের মাদরাসাগুলো মৌলিকভাবে কওমি ধারার। তবে চলতি মাদরাসাগুলোর সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানের কিছু পার্থক্য থাকে। পুরান মাদরাসাগুলো দেওবন্দী ঐতিহ্যবাহী ধারার বলেই প্রতিষ্ঠিত। এসব মাদরাসার নীতিগত অবস্থান সিলেবাস সংষ্কারের বিপক্ষে। কিন্তু মাদানাী নেসাব সংষ্কারের পক্ষে। ফলে পুরান ও আয়তনে বড় মাদরাসাগুলোকে ঐতিহবাদী ধারা বললে মাদানী নেসাব মাদরাসাগুলোকে বলা যায় সংস্কারবাদী ধারা। সিলেবাস ছাড়াও পরিবেশ ও পড়াশোনার পদ্ধতিতে মোটা দাগের ভিন্নতা থাকার ফলে উভয় ধারার ছাত্রদের মানসিকতা ও চিন্তা-চেতনায় বৈচিত্র্য থাকে, কোথাও কিছুটা, কোথাও অনেকটা। অন্তত আমাদের সময় পর্যন্ত এমনটাই ছিলো। বলছি ২০০৮ সালের আগের কথা। আর আমি ছিলাম আমিজানমেশকাত মাদানি নেসাবের ছাত্র। আজকের জামিয়া ইকরা, তখন ছিল ইকরা বাংলাদেশ। আমরা ছিলাম এর উল্লেখযোগ্য ব্যাচ। আমার প্রথম কিতাবখানা শুরু হয় ইকরা বাংলাদেশে।

ইকরা বাংলাদেশের মুহতামিম মাওলানা ফরিদ উদ্দিন মাসউদ সাহেবের তখনকার সংস্পর্শ আমাদের বিশেষভাবে উজ্জীবিত এবং সাহিত্যচর্চায় উদ্দীপিত রাখত। ওস্তাদ রুহুল আমিন কাসেমী, ওস্তাদ ইয়াহইয়া ইউসুফ নদভি এবং ওস্তাদ হুসাইনুল বান্নাহর পৃষ্ঠপোষন ও মোটিভেশন প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার পাশাপাশি সাহিত্যের দিকে আমাদের এগিয়ে দিয়েছিল। লোকে যাকে বলে মেইনস্ট্রিম লিটারেচার, আমি সেসব গোড়া থেকেই পড়া শুরু করেছিলাম। মাইকেল থেকে তখনকার তরুন টোকন ঠাকুর আর প্যারীচাঁদ মিত্র থেকে সুমন্ত আসলাম আমার পড়ার টেবিলে ছিল। মূলত কবিতা ও কথাসাহিত্য ছিল আমার জন্য আকর্ষনকর বিষয়। কালি ও কলম, কালের খেয়া, সাতকাহন ইত্যাদির প্রায় প্রতিটি সংখ্যা আমার সংগ্রহে ছিল।

মনে আছে, আনিসুল হকে মা উপন্যাসের কথা আমি পয়লা জানতে পারি ওস্তাদ হুসাইনুল বান্না সাহেবের কাছে। উস্তাদদের সাথে আমাদের নিয়মিত বই বিষয়ক আলাপে তিনি আমাকে এটি পড়তে বলেছিলেন। পড়ার পর তার সাথে এ নিয়ে আলোচনাও হয়েছিল বলে মনে পড়ে। একবার আমি সৈয়দ শামসুল হকের খেলারাম খেলে যা পড়ছিলাম। বান্না সাহেব এসে দেখলেন। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, যদি বোঝ তাহলে পড়। ইকরার সে সময়ের পরিবেশ কেমন ছিল তার সামান্য ইশারা এই গল্প।

খানিকটা হালকা লেখা হিসেবে যেগুলো সমালোচিত ছিলো তখন, আমি সাধারনভাবে সেসব আমার পড়াসীমার বাইরে রাখতাম। সে কারণে হুমায়ূন আহমেদ, রকিব হাসান, আলতামাশ, হিজাজী, কাসেম বিন আবুবকর, সাইমুম সিরিজ ইত্যাদি শুরুর সময়ে আমার অপড়িত থেকে যায়। সুতরাং স্বভাবতই মাদরাসা পরিমণ্ডলের বাংলা পত্র-পত্রিকা, যেমন মুসলিম জাহান, মদিনা, রহমত, রাহমানি পয়গাম, মুঈনুল ইসলাম ইত্যাদি সম্পর্কে আমি খবরদার ছিলাম না। হাতের কাছে মাসিক পাথেয় থাকায় জানতাম, আছে।

২০০৭/৮ সালে তৃতীয় বর্ষে বা কাফিয়া জামাতে উঠে এক বিশেষ পরিস্থিতিতে ইকরা থেকে মাদরাসাতুল কাউসার আল ইসলামিয়ায় বদলি হলাম আমরা, সদলবল। তবে মাদরাসা দুটির পরিবেশ ও চিন্তা-দর্শনে ব্যাপক ব্যবধান না থাকায় আমার পড়ার ধারা ও গতিতে তেমন বদল হলো না।

আল কাউসার তখন রামপুরা টিভি রোডের ভাড়া বাসায়। পাঁচ তলার যে রুমটিতে আমরা থাকতাম, ওস্তাদ সাঈদ আহমদ সাহেবের দুটি বুকসেলফ ছিল সে রুমে। এখনও পষ্ট মনে আছে,  সেখানে ছিল জীবনানন্দ দাশের উপন্যাস বা গদ্য সমগ্রের রেয়ার কালেকশন। ইকরায় থাকাকালীন আমরা নিয়মিত সদস্য ছিলাম খিলগাঁও কলেজ এবং মাখজানুল উলুম মাদরাসার কাছে থাকা ইসলামি পাঠাগারের। নামে ইসলামি থাকলেও কাজে সেটা ছিল আগাগোড়া সেক্যুলার পাঠাগার এবং অত্যন্ত সমৃদ্ধ। তবু কেন ইসলামি নাম আমি এখনো এর কারণ খুঁজি, মনে মনে। খিলগাঁও আনসার ভিডিপি ক্যাম্পের কাছে শহীদ স্মৃতি বাকি সংসদে ছিল আরও একটি বিরাট পাঠাগার। দুইটারই আমি সদস্য। প্রায় প্রতিদিন যেতাম এবং পুরান বই ফেরত দিয়ে নতুন বই আনতাম। যতদূর মনে পড়ে, নামমাত্র ইসলামি পাঠাগারে পরপর দুই বছর আমরা শ্রেষ্ঠ পাঠক নির্বাচিত হয়েছিলাম। সেখানেও আমরা জীবনানন্দের উপন্যাস সমগ্র পাই নাই, যেটা আল কাউসারের নায়েবে মুহতামিম বা ভাইস প্রিন্সিপাল সাহেবের ব্যক্তিগত সংগ্রহে ছিল। এ থেকে আল কাউসারের সাংস্কৃতিক পরিবেশ সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়।

আমরা বছরের প্রায় মাঝামাঝি আল কাউসারে ভর্তি হলেও অল্পদিনের মধ্যে বাংলা দেয়ালিকা সম্পাদনা এবং সাপ্তাহিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্ব আমাদের হাতে দেন ওস্তাদ সাইফুল্লাহ সাহেব। তিনি ছিলেন আল কাউসারে আমার ব্যক্তিগত ঠিকানা। আমার আব্বা, হাফেজ আবুল কাশেম ছিলেন তার শৈশবের ওস্তাদ। মাদরাসার প্রায় সব সাংস্কৃতিক দায়িত্ব আমাদের হাতে আসায় আগের দায়িত্বশীলরা অনেকটা ব্যথিত হলেও সাধারণ ছাত্রদের খুশি-স্ফূর্তি আমাদের উজ্জীবিত করেছে। আমাদের সাদ রহমান সাঈদ সাহেবের বড় ছেলে। সম্ভবত সে তখন প্রথম বর্ষ বা মিজান জামাতে পড়ত। তুহিন খান সাদের আল কাউসারের মেট। অবশ্য আমরা তখন তুহিনকে মুইনুল ইসলাম নামে জানতাম। মুইনুল ছিল অসম্ভব বইপাগল। মনে আছে, ইমদাদুল হক মিলনের ‘সে’ উপন্যাসটি কোনো এক বিকেলে আমাদের রুমে এসে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থেকেই প্রায় ঘণ্টাখানেকের মধ্যে শেষ করে ফেলেছিল।

শরহে বেকায়ার বছর আমি মাদরাসাতুস সাহাবায়। মেশকাতের বছর যাই মাখজানুল উলুম ও জামিয়া নুরিয়ায়। নুরিয়ায় গিয়ে আমি মাসিক রহমত সম্পর্কে সরাসরি জানলাম এবং সম্পাদক মনযূর আহমদের সঙ্গে পরিচিত হলাম। পরিচিত হবার ঘটনাটা খুব অন্যরকম ছিল, আমার জন্য।

২০১০ সাল। আমাদের বাসা তখন কামরাঙ্গীর চরে। নুরিয়ার মাইল দুয়েক দূরে। আমি তখন এসএসসি বা দাখিল পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছি। বিশ্বকাপ ফুটবল চলছে। সারা দুনিয়ার মতো বাংলাদেশেও তুমুল উন্মাদনা। আকাশী-নীল আর হলুদ রঙের বড় বড় পতাকা বানানো আর আকাশে ওড়ানোর প্রতিযোগিতা, এক পাড়ার সাথে আরেক পাড়ার, এক দলের সাথে আরেক দলের। এই পতাকা ঝোলাতে গিয়ে সারা দেশে বেশ কয়েক জন বিদ্যুতের বাড়ি খেয়ে মারা যায়। এই ঘটনা আমাকে খুবই কষ্ট দেয়। আমি একটা সনেট লেখি। সেটা হাতে লিখে নিয়ে রহমতের অফিসে যাই। মনযুর সাহেব মনোযোগ দিয়ে পড়েন। তারপর প্রশ্ন করেন, কবিতাটা কার? আমি খুব বিব্রত হই। আমি আমার বলার পরও তিনি প্রশ্ন করেন, কোন বই থেকে নিছো? শামসুর রাহমানসহ কয়েকজন কবির নাম নিয়ে জানতে চান এটা তাদের কবিতা কিনা। আমি বেশ শক্ত গলায় বলি, আমার কবিতা। কিন্তু বুঝতে পারি, তিনি বিশ্বাস করতে পারছেন না। এরপর সম্ভবত কবিতা নিয়ে বা না নিয়ে, এখন আর পরিস্কার মনে নাই, চলে আসি আর মনে মনে কাঁপতে থাকি। তার দিন কয়েকের মধ্যে একটা কবিতা লেখি। নামটা এখন আর মনে করতে পারছি না। কবিতাটাও সম্ভবত হারায়ে গেছে। শেষ লাইনটা মনে আছে-

‘‘হয়তো জানো, নয়তো জেনো, কবিরা কবিতায় সত্য।’’

এই কবিতাটাও হাতে লিখে রহমতের অফিসে যাই। সম্পাদক সাহেবের হাতে দিয়ে বলি, ছাপানোর জন্য না, শুধু আপনার পড়ার জন্য। তারপর চলে আসি। তবে আরো কিছু দিন পর, তওমি মাদরাসার সাহিত্যপরিবেশ সম্পর্কে খানিকটা ধারনা পেয়ে বুঝতে পারি, আমার কবিতাকে আমার হিসাবে বিশ্বাস না করার ঐতিহাসিক কারন হয়তো আছে। যাই হোক।

এই ঘরানায় সাহিত্য চর্চার বিস্তারিত পরিসর সম্পর্কে আমি জানলাম আরও বছর খানেক পরে। তবে তার আগেই আমাকে দিয়ে কিছু পরীক্ষামূলক কাজ করিয়ে নিতে শুরু করলেন রহমত সম্পাদক। প্রথমবার এসাইনমেন্ট দেওয়া হলো কবি আল মুজাহিদীর সাক্ষাৎকার নেওয়ার। আমার নেওয়া সাক্ষাৎকার সম্ভবত সম্পাদককে আশাবাদী করতে পেরেছিল এবং সে থেকে কবির সাথে আমার একটি সুন্দর সম্পর্কের শুরু করেছিল। সম্ভবত সে কারণে তিনি আরও একটি সাক্ষাৎকারের জন্য পাঠালেন কবি আল মাহমুদের কাছে। আমি আল মাহমুদের কাছ থেকেও একটি সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎকার নিলাম। এভাবে আমার পড়া যেদিকে গতিশীল ছিল তিনি আমাকে সেদিকে কাজের জন্য উৎসাহিত করতে লাগলেন। প্রায় প্রতিমাসে একটি করে সাক্ষাৎকার নেওয়া হতে থাকল এবং রহমতের একটি স্পেশাল ফিচার হিসেবে এটি পাঠকদের কাছে বিশেষভাবে আদরিত হতে থাকল। এভাবে ধীরে ধীরে রহমতের সাথে আমি যুক্ত হয়ে গেলাম। সম্পাদক সাহেবের অনুপ্রেরণায় ছোটদের বিভাগ বা সাহিত্যবিষয়ক বিভাগের দায়িত্ব পালন করতে শুরু করলাম।

সে বছর আমার মধ্যে এক অদ্ভুত ধরনের সুফি ভাবের উদয় হল। ঢাকার মাদরাসাগুলোর আধুনিক প্রবণতার বিপরীতে বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের মাদরাসাহমূহের ঐতিহ্যবাহী ধারার মুজাহাদার গল্প আমাকে বেশি আকৃষ্ট করল। আমার মাদানি নেসাব মন কিসের আকর্ষণে এ বৈপরিত্ব অতিক্রমের জন্য সনাতনের দিকে উড়াল দিল, সে আমার বিরাট বিস্ময়। সকল শহুরে বিষয়-আশয় এবং বিশেষত ঢাকাইয়া কালচার বিসর্জন দিয়ে আমার মন হাটহাজারি যাবার জন্য আকুল হয়ে উঠল| আশৈশব সদলবলে মুখর আমি একাকী হাটহাজারি মাদরাসায় ভর্তি বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিলাম| আলোচনা সূত্রে জানলাম, মনযূর আহমদ সাহেব আশির দশকে হাটহাজারি থেকে দাওরায়ে হাদিস পাস করেছেন| হাটহাজারি মাদরাসার বর্তমান ওস্তাদ মাওলানা আশরাফ আলী নিজামপুরি সাহেবের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ| মাসিক রহমতের সম্পাদক হিসেবে সারাদেশের মাদরাসা মহলে তিনি বিশেষভাবে পরিচিত এবং নিজামপুরি সাহেব তখন একাধিক জনপ্রিয় বাংলা বইয়ের লেখক| তার মিডিয়া সন্ত্রাস বইটি তখন মাদরাসা মহলে ব্যাপকভাবে আলোচিত। ফলে সম্পাদকের যোগাযোগে আমার ভর্তি বিষয়ে নিজামপুরি সাহেবে থেকে সহযোগিতার আশ্বাস পাওয়া গেল। আমি আল্লাহকে সঙ্গী করে বাংলাদেশের বড়তম কওমি মাদরাসায় রওনা হলাম। দাওরায়ে হাদিসে ভর্তির মাধ্যমে হাটহাজারিতে আমার জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হলো।

মাদরাসা হিসেবে এতকাল আমি যেমনটি দেখে এসেছি, হাটহাজারি তার থেকে অনেক বড় এবং ব্যতিক্রম| হাটহাজারির বিশালতা শুরুর সময়গুলোতে আমাকে ভীষণ অসহায় করে তুলেছিল। একদিকে এর বিস্তারিত অস্তিত্বের তুলনায় নিজেকে নিতান্তই ক্ষুদ্র মনে হতো| অপরদিকে সুবিশাল পরিসরে নিজেকে বিকাশ করার এক সংগোপন স্বপ্ন আমাকে প্ররোচিত করত| নিজামপুরি সাহেবের আন্তরিক সহযোগিতায় দারে জাদিদের তৃতীয় তলার সবচেয়ে সুন্দর রুমটিতে আমার থাকার ব্যবস্থা হলো| এই রুমের সুবিধাগুলো সারা বছর আমি উপভোগ করেছি| আমার পাশের সিটে ছিলেন ছড়াকার ইলিয়াস সরোয়ার| মুফতি আবুল কাশেম আদিল সে বছর ইফতা বা ইসলামি আইন বিভাগে পড়তো নিজামপুরি সাহেবের পাশের রুমে তিনি থাকতেন| বছরের শুরুতে ওস্তাদ আমাকেও সে রুম পছন্দ করার প্রস্তাব করেছিলেন। কিন্তু সবচেয়ে আলো ঝলমলে এবং সবসময় বাতাসের বিহাররত এই কামরাটি আমাকে বিশেষভাবে মুগ্ধ করে রেখেছিল| জানি না কেন, আশৈশব আমি আলোর জন্য ব্যাকুল থাকি। বাতাসের চলাচল আমার আত্মাকে চঞ্চল রাখে।

জন্মমাত্র দেখেছি, আমাদের ঘরটি ছিল বাড়ির একেবারে দখিনে| তারপর একটি সরু ডোবা, আমরা বলতাম গড়। তারপর রাস্তা। রাস্তার দখিন থেকে শুরু হয়েছে আদিগন্ত ফসলের মাঠ-আমরা বলতাম আলুর বিল| আলুর বিল যেখানে শেষ, সেখানেই অজগরের মতো বিশাল শরীর নিয়ে আড়াআড়ি শুয়ে আছে উন্মত্ত পদ্মা নদী| দুর্নিবার পদ্মার দুরন্ত বাতাস এক লাফে আলুর বিল পার হয়ে আমাদের ঘরে এসে প্রথম আছড়ে পড়ত। তুমুল বাতাসের সঙ্গে তাই মিতালি পাতিয়ে কেটেছে আমার শৈশব। সম্ভবত সেই থেকে আমি বাতাসের অভ্যেস, আমি আলোর আকাঙ্ক্ষা।

হাটহাজারির ভর্তিবিষয়ক প্রাতিষ্ঠানিকতা তুলনামূলক জটিল এবং দূর-আসাদের জন্য অত্যন্ত দুরূহ ছিল| তথ্যকেন্দ্র না থাকাটা ভয়াবহ ভোগান্তির সৃষ্টি করত আমাদের সময়ে| প্রায় ছয় হাজার ছাত্রের ভর্তি নিশ্চিত হওয়া এবং সিট বিন্যাসের সুরাহা হতে মোটামোটি দুই সপ্তাহ লেগে যেত| সপ্তাহ দুয়েক পরে উদ্বোধনী সবক বা ইফতিতাহ অনুষ্ঠান হলো। বাংলা-পাক-ভারত উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় হাদিসের দরস বা ক্লাস হয় হাটহাজারি মাদরাসায়| দারুল উলুম দেওবন্দ দুনিয়ার সব কওমি মাদরাসার মা হলেও হাটহাজারির দাওরায়ে হাদিসের ছাত্রসংখ্যা দেওবন্দ থেকে বেশি| সে হিসেবে হাটহাজারির দাওরায়ে হাদিসের দরসগাহকে অনেকে বর্তমান পৃথিবীর বড়তম হাদিসের ক্লাস মূল্যায়ন করেন| বুখারি শরিফের প্রথম সবক দিলেন হাটহাজারি মাদরাসার তখনকার মহাপরিচালক, পরে হেফাজতে ইসলামের আমির, আল্লামা শাহ আহমদ শফি র.| তার শাগরেদ হিসেবে তার সইসহ বুখারি শরিফের সনদ পাওয়ার নসিব আল্লাহ আমাকে দান করেছিলেন| হাটহাজারির সে বছর আমার জীবনে এক নতুন অধ্যায়ের শুরু করেছিল|

বাংলাদেশের ইতিহাসে বাংলাদেশি মুসলমানের বড়তম যে ইনকিলাব ঘটতে যাচ্ছিল শাপলায়, ঠিক তার আগের বছর সে ইনকিলাবের রুহকেন্দ্রে আল্লাহ আমাকে হাজির করলেন| এক বছর পরে যে মহাপুরুষ বাংলাদেশের ছাত্র-জনতার হৃদয়ের স্পন্দনে পরিণত হবেন, আধিপত্যবাদ মোকাবেলা করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা রক্ষা এবং বাংলাদেশী জনগনের নাগরিক অধিকার-পরিচয় প্রতিষ্ঠায় সংগ্রামে যিনি বীরের ভূমিকায় হাজির হবেন, তার সোহবতে-সান্নিধ্যে থেকে একটি বছর অতিক্রমের সুযোগ করে দিলেন| এটা নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালার বিশেষ অনুগ্রহ| নয়তো মাদানি নেসাব মনা এক তরুন কোনো কারণ ছাড়া অভ্যস্ত শহুরে পরিবেশ রেখে সম্পূর্ণ একলা সাথীহারা অবস্থায় হাটহাজারির পরিবেশে যাওয়ার জন্য এমন আকুল হয়ে উঠবে কেন? তাকে দিয়ে কোনো বিশেষ কাজ করিয়ে নেওয়ার সংকল্প কি আল্লাহর মহাপরিকল্পনার গায়েবি জ্ঞানে হাজির ছিল?

সবক শুরু হওয়ার কিছুদিনের মধ্যে পরিচয় হয় আব্দুল্লাহ তামিমের সঙ্গে| বয়সে-চিন্তায় আমাদের মধ্যে একটা মিল পাই আমরা| দুইজনেই সাহিত্যে বিশেষভাবে আগ্রহী| কিন্তু এই নতুন পরিবেশে কোনো সঙ্গী না থাকায় আমাদের আগ্রহ চাপা থেকে যাচ্ছে| এই অনুভব থেকে মাত্র দুইজন মিলেই আমরা একটি সাপ্তাহিক পাঠচক্র শুরু করি| প্রতি বিষ্যুদবার এশার পর আমরা দাওরায়ে হাদিসের দরসগাহে লেখা নিয়ে বসতাম| নিজেদের লেখা সেখানে পড়া হতো| একে অপরের লেখার সমালোচনা-মূল্যায়ন করতাম| কয়েক সপ্তাহ চলার পর আমাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত হলেন ইলিয়াস সরোয়ার ও ইবরাহিম জামিল| এভাবে একে একে আমাদের সংখ্যা বাড়তে থাকল| নতুন করে আরও যুক্ত হলেন আব্দুল্লাহ আল খায়ের, এনামুল হক, জিন্নাহ, মাহমুদাতুর রহমানের ভাই হেদায়াতুল ইসলাম, মুজাহিদ সায়ীদ, শিহাব সাকিবসহ মনে না পড়া অনেক ভাই-বন্ধু| পাঠচক্রে শরিক না থাকলেও বছরের শেষের দিকে পরিচয় হয় মাবরুরুল হক ও মোহাম্মাদুল্লাহ আরমানের সঙ্গে| সবার আগ্রহী অংশগ্রহণে প্রতি বিষ্যুদবার সন্ধ্যাটা আমাদের কাছে মহা আনন্দ নিয়ে হাজির হতো| সবার পড়িত লেখাগুলো আমরা প্রতি সপ্তাহে জমা রাখতাম| সেখান থেকে সুন্দর লেখাগুলো নিয়ে মাঝে মাঝে মাসিক রহমতে ছাপতাম| বছরের প্রায় মাঝামাঝি সময়ে আয়োজকের জায়গা থেকে আমরা ঘোষণা করেছিলাম, সারা বছরের ভালো লেখা নিয়ে বছর শেষে একটা বিশেষ সংকলন করব| এই ঘোষণা সবাইকে বিশেষভাবে উৎসাহী করেছিল| ফলে পাঠচক্রীর সংখ্যা দিন দিন আমাদের আজিব করে দিয়ে বাড়তে লাগল| যেহেতু মাদরাসার ভেতরে যে-কোনো জমায়েত, দলীয় ও রাজনৈতিক সভা নিষিদ্ধ, ফলে আমাদের নিরীহ সাহিত্যিক আয়োজনও মাদরাসাওয়াদের বিশেষভাবে সন্দিগ্ধ করে তুলল| দায়িত্বশীল ওস্তাদ লোক লাগিয়ে আমাদের সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য তালাশ করতে লাগলেন| এটি আমাদের বিশেষভাবে চিন্তিত করে তুলল| কিন্তু ঘাবড়ে গেলাম না| আমাদের পাঠচক্র বন্ধহীনভাবে চালিয়ে যেতে থাকলাম| যারা তথ্য তালাশের নিয়তে আমাদের সঙ্গে মিশেছিল, কিছুদিনের মধ্যে তারাও আমাদের সঙ্গী হয়ে গেল| তখন অবধারিতভাবে আমাদের পক্ষে প্রতিবেদন জমা হলো| সবকিছু সম্পর্কে বিস্তারিত শুনে আমাকে ডেকে নিয়ে দায়িত্বশীল ওস্তাদ পরামর্শ দিলেন, আমরা যেন এই আয়োজন মাদরাসার বাইরে কোথাও করি| তখন জিন্নাহর আগ্রহে তার লাইব্রেরিতে সপ্তাহের নির্ধারিত দিনে আমরা পাঠচক্র চালিয়ে যেতে থাকলাম| পাশাপাশি সবার অনুরোধে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যবিষয়ক একটি শিখন কর্মশালার আয়োজন শুরু করতে হলো| আমি ও আব্দুল্লাহ তামিম অত্যন্ত পরিশ্রম করে ব্যাকরণ, আবৃত্তি, রচনা ও অনুবাদের জরুরি বিষয়গুলো সম্ভবমতো সহজ ভাষায় শিখনকামীদের সামনে উপস্থাপন করতে সচেষ্ট থাকলাম| দেখা গেল, কোর্স শেষে প্রায় প্রত্যেকের মধ্যে গুণগত পরিবর্তন এসেছে| কারো কারো লেখায় ভালো রকম উন্নতি দেখা গেল|

বছরের মাঝামাঝি বা আরও কিছুসময় পর শাহবাগ আন্দোলন দানা বাঁধতে শুরু করল| আমরা শুরু থেকে বিষয়টির ওপর নজর রাখলাম| কিন্তু শুরুর উদ্দেশ্য বদলে ফেলে তারা যখন নিশানায় পরিণত করল বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে, তখন হেফাজতে ইসলাম দেশ রক্ষায় রাজপথে নেমে এল| গোটা বাংলাদেশের আলেম-ওলামা, রাজনীতিক, পেশাজীবী, মিডিয়াকর্মী, বুদ্ধিজীবী ও তৌহিদি জনতার সতর্ক দৃষ্টি তাক করা থাকল হাটহাজারি মাদরাসায়| আমি যদিও তখন ছাত্র। আমার সাংবাদিকতা চলমান ছিলো ঢাকায়। এবং অবশ্যই মাদরাসার বাইরে। রহমতের সাহিত্য বিভাগ দেখার পাশপাশি আমি তখন প্রতি মাসে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার নিয়ে থাকি। এটি এরই মধ্যে রহমতের বেশ পাঠকপ্রিয় বিভাগে পরিনত হয়েছিলো।

এই চরম উত্তেজক মুহূর্তে শাপলা জাগরনের রুহকেন্দ্র হাটহাজারীতে চলছিলো আন্দোলনের প্রস্তুতি। সারা দেশের মিডিয়া যখন হাটহাজারীমুখী, তখন ছাত্র থাকা সত্ত্বেও সাংবাদিক হিসেবে ভূমিকা নেওয়া আমার জন্য জরুরি হয়ে উঠল| ওস্তাদ আশরাফ আলী নিজামপুরি সাহেবের আন্তরিক সহযোগিতায় মাসিক রহমতের জন্য হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব হাফেজ জুনায়েদ বাবুনগরীর একটি গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষাৎকার নিতে সমর্থ হলাম| আমার পেশাগত কর্মতৎপরতা অনিবার্যভাবে মাদরাসার ভেতরমহলে শুরু হয়ে গেল|

এই উত্তাল সময় দেখতে দেখতে চোখের পলকে বছর ফুরিয়ে এল| পাঠচক্রে জমানো লেখাগুলো বাছাই ও এডিট করে একটি সংকলন তৈরি করতে থাকলাম| সবার মতামতে নাম ঠিক হলো ‘সূর্যোদয়’| শুরুতে আমাদের তরফে প্রকাশের চিন্তা থাকলেও পরে অনুমতি নিয়ে মাদরাসার প্রকাশনা হিসেবে ছাপার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো| এ পর্যায়ে আমরা এক নতুন অবস্থার মুখোমুখি হলাম|

হাটহাজারির মরহুম ওস্তাদ মাওলানা বেদারুল ইসলামের বড় ছেলে এবং বর্তমান মুহাদ্দিস মাওলানা দিদারুল ইসলামের ভাতিজা মোহাম্মদ আনিস আমাদের সহপড়ুয়া ছিলেন| আনিস ছিলেন তখনকার নাজেমে তালিমাত বা শিক্ষা সচিব হাফেজ জুনায়েদ বাবুনগরীর অত্যন্ত স্নেহভাজন| আনিস মারফত জানা গেল, মাদরাসার উদ্যোগ বা তত্ত্বাবধানে এ পর্যন্ত কোনো বাংলা প্রকাশনা হয়নি| ফলে বাংলা ভাষায় হবার কারণে সূর্যোদয়ের অনুমতি পাওয়া বেশ লম্বা সফর হয়ে গেলো| বহুদিনের বহু চেষ্টার পর শেষে মহাপরিচালক আল্লামা শাহ আহমদ শফি ও নাজেমে তালিমাত হাফেজ জুনায়েদ বাবুনগরী সাহেবের অনুমতি ও অভিমতসহ সূর্যোদয় ছাপা হলো|

হাটহাজারির ইতিহাসে এটি প্রথম বাংলা প্রকাশনা হিসেবে বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকল| আক্ষরিক অর্থে একে হাটহাজারির বাংলা প্রকাশনার সূর্যোদয় বললে অত্যুক্তি হবে না| আমি, আব্দুল্লাহ তামিম ও জামিল ইব্রাহিম এর সম্পাদনার দায়িত্বে ছিলাম|

বাংলাদেশসহ পাক-ভারত উপমহাদেশের কওমি মাদরাসাগুলোতে শিক্ষাবছর শেষে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বরকতময় অনুষ্ঠান হিসেবে উদযাপিত হয় খতমে বুখারি| আমাদের সময় পর্যন্ত হাটহাজারিতে এটি প্রতিবছর বিশাল আয়োজন করে হতো| সারাদেশে হাটহাজারির যত নিবন্ধিত মাদরাসা আছে, তাদের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা এতে অংশ নিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসতেন| বিশেষত চট্টগ্রাম অঞ্চলের প্রায় প্রতিটি বড় মাদরাসায় সেদিন ছুটি দেওয়া হতো| ছাত্র-শিক্ষক সবাই খতমে বুখারিতে অংশ নিতেন| প্রায় পনেরো থেকে বিশ হাজার মানুষের এক বিশাল সহাসমাবেশ ঘটত| সবার জন্য বিশেষ মেহমানদারির ব্যবস্থা করা হতো| খতমে বুখারি কেন্দ্র করে মাদরাসার ভেতরে প্রায় সাত দিনব্যাপী একটি বিশেষ আনন্দগভীর পরিবেশ রাজ করত| একই সঙ্গে ছাত্রদের জন্য এটি ছিল নেতৃত্বদক্ষতা ও দায়িত্ব সচেতনতা প্রমাণের সময়| এ জৌলুসপূর্ণ অনুষ্ঠানের সঞ্চালনা বা উপস্থাপনার সম্মানজনক দায়িত্ব পালনের জন্য প্রতিবছর সামনের সারির ছাত্রদের মধ্যে ভীষণরকম প্রতিযোগিতা হতো|

সাধারণত চট্টগ্রামের ছেলেরাই এতে এগিয়ে থাকত| শুধু খতমে বুখারি না, এ ধরনের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন, এমনকি দরসে এবারত বা ক্লাসে সবক পড়ার বিষয়টিও চট্টগ্রামের ছাত্ররা খানিকটা কৌশল করে হলেও নিজেদের দখলে রাখতে চেষ্টা করত| এখনকার অবস্থা আগের চেয়ে আলাদা কিনা, জানা নাই।

আমাদের বছর, ২০১১-১২ শিক্ষাসালে, দাওরায়ে হাদিসে প্রায় দুই হাজার ছাত্র ভর্তি ছিল| বিরল ব্যতিক্রম বাদ দিলে অচট্টগ্রামীয় ছাত্রদের জন্য এবারত পড়া ছিল প্রায় অসম্ভব| চট্টগ্রামের ছেলেদের মধ্যে একটা আঞ্চলিক ঐক্য অটুট দেখেছি| ঢাকা-সিলেটসহ অন্যান্য এলাকার ছাত্রদের মধ্যেও এমন কমিউনিটি দেখা যেত| মাদরাসার ভেতরে চট্টগ্রামের পর অন্যতম প্রভাবশালী ইউনিটি ছিল ঢাকার ছাত্রদের মধ্যে| তবু দরসের প্রথম সারিতে বসার জন্য অন্য এলাকার ছাত্ররা খুব সামান্যই সুযোগ পেত| এমন পিছিয়ে থাকা অবস্থায় এবং প্রতিকূল পরিবেশে আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহে কী করে যেন খতমে বুখারি অনুষ্ঠান উপস্থাপনার দায়িত্ব আমাদের হাতে এসে পড়ল| মূলত এক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে আমার বন্ধু আব্দুল্লাহ তামিম|

অনুষ্ঠানের দিন আমি যখন মাইক্রোফোন নিয়ে মঞ্চে দাঁড়ালাম, অবাক হয়ে খেলায় করলাম, চট্টগ্রামের প্রভাবশালী ছাত্রদের মধ্যে একটা অস্থিরতা ও অসহনশীল ছোটাছুটি শুরু হয়ে গেল| সামনে বসা অনেকে আমাকে মাইক ছেড়ে দিতে পরামর্শ দিলেন| কিন্তু আমি এর কোনো কারণ খুঁজে পেলাম না| একপর্যায়ে তাদের অনেকে কিছুটা উচ্চৈঃস্বরে আমাকে উদ্দেশ্য করে বলাবলি শুরু করে দিল| পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে কি না মঞ্চ থেকে সেটা আমি গভীরভাবে খেয়াল রাখলাম| খানিকটা অশান্তি অনুভব করলেও ঘাবরে গেলাম না| কারণ সারাদেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার হাজার হাজার মানুষ খতমে বুখারিতে অংশ নেন| এই বিরাট আয়োজনে উপস্থাপনার বিষয়টি প্রধানত যোগ্যতার ওপরেই নির্ভরশীল| এতে কারো বা কোনো আঞ্চলিক কমিউনিটির নাখোশ হবার কারণ ছিল না| ফলে কারো উষ্মা ও অসন্তোষকে আমলে না নিয়ে শেষ পর্যন্ত আমার দায়িত্ব পালন করে যেতে থাকলাম| অনুষ্ঠান শেষে তাদের অনেকে ঠিক কী কারণে জনি না আমার দিকে এগিয়ে আসতে শুরু করলে কাছের বন্ধু ও অনুরাগী সাধারণ ছাত্ররা আমাকে একরকম ঘিরে ধরল| আমি প্রায় সদলবল রুমে যেতে পারলাম| পরে বিষয়টি আর বেশি দূর এগোয়নি| এতে এগুনোর মতো কোনো কিছু ছিল বলেও আমি মনে করি না| আজকালের ছাত্রদের মুখে শুনেছি, এ ধরনের অবস্থা কিছুটা বদলেছে|

দাওরায়ে হাদিস শেষ করার মাধ্যমে কওমি শিক্ষাধারার একমুখি আবিশ্যক কারিকুলাম শেষ হয়। যারা দাওরা পাশ করেন তাদেরকে মাওলানা উপাধি দেওয়া হয়। আমার দাওয়া শেষ হওয়ার পর বিশয়ভিত্তিক উচ্চশিক্ষার আগ্রহ নিয়ে হাটহাজারির তাফসির বিভাগে ভর্তি হয়েছিলাম| যদিও রহমতের সম্পাদকীয় দায়িত্ব এবং অন্যান্য পত্রিকায় নিয়মিত লেখার কাজ অব্যাহত ছিল| তবুও নিবিড়ভাবে তাফসির পড়ার ইচ্ছা ছিল| কিন্তু বাংলাদেশের তখনকার তুমুল সময় আমাকে তার ঢেউদোলানো দরিয়ার মাঝখানে ছুঁড়ে দিল| হেফাজতে ইসলাম ততদিনে বিভাগীয় শানে রিসালাত সম্মেলন শেষ করে সরকারের কাছে ১৩ দফা দাবি পেশ করেছে| বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় লংমার্চ করার ঘোষণা দিয়েছে| আরেক দিকে জেলায় জেলায় গণজাগরণ মঞ্চের নামে হাসিনা ও তার মনিব ভারতের মদদে দেশ ধ্বংসের উৎসব চলছে। এতে বাংলাদেশের শান্তিপ্রিয় মানুষ চরম ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল।

এ অবস্থায় আমি দেখলাম, আমার চোখের সামনে সমগ্র বাংলাদেশ প্রচণ্ড ভূমিকম্পের মতো দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গেল| এক ভাগে শাহবাগ অথবা বাংলাদেশের স্বাধীনতা, নাগরিক অধিকার ও সংস্কৃতি ধংসের মাধ্যমে বাংলাদেশকে ভারতের কলোনি করার নির্বোধ উল্লাস আর ফ্যাসিবাদের পাটাতন তৈরির তোড়জোড়। অপর দিকে বাংলাদেশপন্থী ছাত্র-জনতার বিশাল বিশাল সমাবেশ, যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সংস্কৃতি ও নাগরিক অধিকার আদায়ের জন্য জীবন দিতে নিয়ে প্রস্তুত।

আমি এইচএসসি বা আলিম পরীক্ষায় অংশ নিতে কিছুদিনের জন্য ঢাকায় এলাম। আন্দোলনে উত্তাল বাংলাদেশ তখন গরম কড়াই হলে ঢাকা তখন জ্বলন্ত আগুন। কয়েক মাস আগে থেকেই রহমতের নিয়মিত সাক্ষাৎকারে আমার কমন টপিক ছিল শাহবাগ ও শাপলা। সাক্ষাৎকার নিচ্ছিলাম দেশে বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী-চিন্তাবিদ-রাজনীতিকদের। তাদের তালিকায় ছিলেন ফরহাদ মজহার, ড. তুহিন মালিক, ড. এসএম লুৎফর রহমান, জেনারেল ইবরাহীম বীরবিক্রম, শাহ আহমাদুল্লাহ আশরাফ, আসাদ চৌধুরীসহ আরো অনেকে। ঢাকায় এসেই আন্দোলনে জড়িয়ে গেলাম। লংমার্চে আমরা ছাপলাম বিপ্লবী ছাড়ার কাগজ পেড়েক। আয়োজন করেছিলাম সম্ভবত রোকন রাইয়ান ও আব্দুল্লাহ আল মাহমুদসহ কয়েকজন। সে অবিস্মরনীয় লংমাচ যারা দেখে নাই তাদের কোনদিন তা বোঝানো সম্ভব না। সে এক অশেষ ইতিহাস। তখন আমার এইচএসসি পরীক্ষা চলছে বা দুয়েক দিনে শুরু হবে। লংমার্চ থেকে এক মাস পর ঢাকা অবরোধের হলো ঘোষনা আসলো। গোটা বাংলাদেশ সেদিন থেকে আগুনের জ্বলন্ত চুলা।

ঐতিহাসিক ৫ মে ২০২১৩, ঢাকা অবরোধের দিন আমার শেষ পরীক্ষা- ইংরেজি। মোহাম্মদপুরের কাদেরিয়া মাদরাসায় ছিলো কেন্দ্র। পরীক্ষা শুরুর আগেই আমরা ছাত্রদের থেকে চাঁদা তুলে ব্যানার বানানোর জন্য একজনকে নীলক্ষেত পাঠিয়ে দিলাম| পরীক্ষা শেষ হবার আগেই বিরাট ব্যানার আমাদের হাতে এসে গেল| সময় শেষ হবার কিছুক্ষণ আগে প্রিন্সিপাল সাহেব প্রত্যেক রুমে গিয়ে সমাবেশে না যাবার জন্য ছাত্রদের নির্দেশ দিলেন| সঙ্গে ছিলেন কয়েখজন পুলিশ সদস্য। কিন্তু তিনি রুম থেকে বের হবার সঙ্গে সঙ্গে ছাত্রদের মুহুর্মুহু স্লোগানে পরীক্ষার হল গমগম করে উঠল| সময় শেষ হতে না হতেই মাদরাসার মাঠে ছাত্র-শিক্ষক ও বাংলাদেশপন্থী ছাত্র-জনতার এক বিশাল জমায়েত ঘটে গেল| আমরা তখন ব্যানার খুলে জমায়েতের সামনে দাঁড়িয়ে মিছিল দিতে দিতে মোহাম্মদপুর কাঁপিয়ে রাস্তায় নেমে এলাম। শুরু হলো শাপলা চত্বর অভিমুখে আমাদের পথচলা| এই নতুন পথ আমাকে আর হাটহাজারিমুখী হতে দিল না। আমার আর তাফিসির পড়া হলো না। এই অনন্ত পথচলাই হয়ে গেলো আমার নসিব। এই পথের কি শেষ আছে, কোন দিন, মরনের আগে?

এই পথ ধরেই আমি হাটতে হাটতে চলতে চলতে পড়তে পড়তে খোঁড়াতে খোঁড়াতে জীবন পিঠে নিয়ে উঠে এলাম শাপলা চত্বরের রাতের জাহান্নাম থেকে। তারপর আবার পড়তে পড়তে উঠতে উঠতে নিরাপদ সড়ক আন্দোলন, কোটাবিরোধী আন্দোলন, মোদী বিরোধী আন্দোলন পার হয়ে চব্বিশে এসে জুলাই বিপ্লবে দাঁড়ালাম।

বিজ্ঞাপন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments